চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে তথ্যপ্রযুক্তিই যেখানে বিশ্ব চালিকাশক্তি, সেখানে বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে এক গভীর সংকটের কিনারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ (AI) খাতে যদি এখনই জাতীয় সক্ষমতা বা ‘Capacity Building’ না বাড়ানো হয়, তবে আগামী এক দশকের মধ্যে বিশ্ব মানচিত্র থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে এআই-এর নিয়ন্ত্রণহীন ও নেতিবাচক ব্যবহার আগামী দিনের যুবসমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
শনিবার (২৯ নভেম্বর) রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র অডিটোরিয়ামে আয়োজিত দিনব্যাপী ‘এআই লিটারেসি ওয়ার্কশপ’-এ এমনটাই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (UIU) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ আল মামুন। তার এই মন্তব্যে বাংলাদেশের ডিজিটাল ভবিষ্যতের এক উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে।
এক দশকের মধ্যে ‘গ্লোবাল ডিসকানেক্ট’ হওয়ার ভয়
আধুনিক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলাই একমাত্র পথ। অধ্যাপক মামুনের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আর কেবল গবেষণার বিষয় নয়, এটি এখন জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, “আমরা যদি এখনই এআই প্রযুক্তিতে নিজেদের দক্ষ করে না তুলি, তবে আগামী ১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্ব থেকে প্রযুক্তিগতভাবে বিচ্ছিন্ন বা ‘Isolated’ হয়ে যাবে।” বিশ্ব যখন ‘অটোমেশন’ এবং ‘ডেটা সায়েন্স’-এর ওপর ভর করে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের এই স্থবিরতা ভবিষ্যতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
আফ্রিকার চেয়েও পিছিয়ে বাংলাদেশের ‘এআই মুভমেন্ট’
বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ফানুস ওড়ানো হলেও বাস্তব চিত্র বেশ করুণ বলে মন্তব্য করেন এই শিক্ষাবিদ। তুলনামূলক আলোচনায় তিনি আফ্রিকা মহাদেশের প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তিনি বলেন, “বর্তমানে বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যে ‘মুভমেন্ট’ বা জাগরণ থাকার কথা ছিল, তা আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোর চেয়েও পিছিয়ে আছে।” যেখানে আফ্রিকার অনেক দেশ এআই পলিসি এবং ইনোস্ট্রাকচার বা অবকাঠামো উন্নয়নে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ এখনো প্রাথমিক স্তরেই ধুঁকছে।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বনাম যুবসমাজের অবক্ষয়
প্রযুক্তির এই ‘ডাবল এজড সোর্ড’ বা দুধারী তলোয়ারের মতো আচরণের কথাও উঠে আসে আলোচনায়। অধ্যাপক খন্দকার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, যদি সঠিক পরিকল্পনা বা ‘গাইডলাইন’ মেনে এআই ব্যবহার করা যায়, তবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশের অর্থনীতির চেহারাই বদলে যেতে পারে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, নতুন ‘জব ক্রিয়েশন’ এবং স্মার্ট সলিউশনের মাধ্যমে জিডিপিতে বিশাল অবদান রাখা সম্ভব।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠটি অত্যন্ত ভয়ানক। তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “এআই-এর ইতিবাচক ব্যবহারের পাশাপাশি এর নেতিবাচক প্রভাব বা ‘Misuse’ যুবসমাজকে ধ্বংস করে দিতে পারে।” ডিপফেক (Deepfake), সাইবার বুলিং, তথ্যের বিকৃতি এবং প্রযুক্তি আসক্তি তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য ও নৈতিকতাকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। এআই লিটারেসি বা স্বাক্ষরতা না থাকলে এই ঝুঁকি মোকাবিলা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
অস্ট্রেলিয়ার বার্তা: চাই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন
কর্মশালায় প্রযুক্তির আলোচনার পাশাপাশি উঠে আসে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়টিও। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনের রাজনীতি বিষয়ক ফার্স্ট সেক্রেটারি লরা অ্যাডাম।
দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে লরা অ্যাডাম বলেন, “অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে পাশে আছে এবং ভবিষ্যতে এই সম্পর্ক আরও গভীর হবে।” এ সময় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের প্রসঙ্গ টেনে তিনি মন্তব্য করেন, অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বা ‘Free and Fair Election’ দেখতে চায়, যা দেশের স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।
উপসংহার দিনব্যাপী এই কর্মশালায় বক্তারা একমত হন যে, এআই প্রযুক্তিকে ভয় না পেয়ে একে জয় করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। তবে তার জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সঠিক নীতিমালা, শিক্ষাব্যবস্থায় এআই-এর অন্তর্ভুক্তি এবং জনসচেতনতা। অন্যথায়, ডিজিটাল বৈষম্যের শিকার হয়ে পিছিয়ে পড়া জাতি হিসেবেই থাকতে হবে বাংলাদেশকে।