বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পথে নতুন মাইলফলক
দেশের বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন এবং অধস্তন আদালতের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। অধস্তন আদালতের আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার সার্বিক নিয়ন্ত্রণ প্রধান বিচারপতির হাতে ন্যস্ত করে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ-২০২৫’ জারি করা হয়েছে।
রোববার (৩০ নভেম্বর) রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এর আগে গত ২০ নভেম্বর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত এই অধ্যাদেশের খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। সংবিধানের ২২, ১০৯ এবং ১১৬ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় নামে একটি স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার জন্যই এই অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছে।
প্রধান বিচারপতির হাতে আর্থিক ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ
নতুন অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিচার বিভাগের উন্নয়ন বা কারিগরি প্রকল্পের অনুমোদন সংক্রান্ত আর্থিক ক্ষমতায় বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে:
১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত অনুমোদন: বিচার বিভাগের উন্নয়ন বা কারিগরি প্রকল্পের এবং অনুন্নয়ন বাজেটের আওতায় কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রাক্কলিত ব্যয় ১০০ কোটি টাকা হলে তার অনুমোদন সরাসরি দিতে পারবেন প্রধান বিচারপতি।
ঊর্ধ্বসীমা বৃদ্ধি: সরকার সময়ে সময়ে, সুপ্রিম কোর্টের সাথে পরামর্শ করে এবং সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই আর্থিক সীমা মুদ্রাস্ফীতির সাথে সমন্বয় করে বা অন্য কোনো উপযুক্ত কারণে বৃদ্ধি করতে পারবে।
NEC-তে প্রেরণ: আর্থিক পরিমাণ ১০০ কোটি টাকার চেয়ে বেশি হলে তার অনুমোদন নিতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (NEC)তে উপস্থাপনের জন্য পরিকল্পনামন্ত্রীর নিকট পাঠাতে হবে।
পৃথক সচিবালয় ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ
অধ্যাদেশের ৪ ধারায় বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ প্রধান বিচারপতির উপর ন্যস্ত থাকবে এবং এই সচিবালয়ের সচিব হবেন এর প্রশাসনিক প্রধান।
অধস্তন আদালত ও প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় সব প্রশাসনিক ও সাচিবিক দায়িত্ব পালন করবে এই সচিবালয় (ধারা ৫)। এর কার্যাবলীর মধ্যে রয়েছে:
অধস্তন আদালতের প্রতিষ্ঠা, বিলোপ, সংখ্যা ও এখতিয়ার নির্ধারণ।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়, সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রি ও প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদ সৃজন, নিয়োগ, পদায়ন, বদলি, শৃঙ্খলা ও ছুটি সংক্রান্ত বিষয়াদি।
জুডিশিয়াল সার্ভিস প্রশাসন: সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সার্ভিস সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিধান সংক্রান্ত কাজে রাষ্ট্রপতির পক্ষে প্রয়োজনীয় সকল প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করবে (ধারা ৭)।
পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কমিটি গঠন
অধ্যাদেশের ৮ ধারায় বিচার বিভাগের প্রকল্পের চূড়ান্ত নিরীক্ষা ও সুপারিশ করার লক্ষ্যে ৮ সদস্যের একটি পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।
কমিটির প্রধান: এই কমিটির প্রধান হবেন প্রধান বিচারপতি কর্তৃক মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি।
অনুমোদনের ক্ষমতা: পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কমিটি কর্তৃক সুপারিশকৃত প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৫০ কোটি টাকার মধ্যে থাকলে প্রধান বিচারপতি অনুমোদন করবেন। ৫০ কোটি টাকার বেশি হলে তা অনুমোদনের জন্য সরাসরি পরিকল্পনামন্ত্রীর নিকট প্রেরণ করা হবে।
বাজেট ব্যবস্থাপনা ও ফিসকাল অটোনমি
অধ্যাদেশের ১১ ধারায় বিচার বিভাগের বাজেট ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রত্যেক অর্থবছরের জন্য আদালত, প্রতিষ্ঠান ও দপ্তরের অনুমিত আয় ও ব্যয়-সংবলিত একটি বিবৃতি প্রস্তুত করবে।
প্রধান বিচারপতি উক্ত বিবৃতি সরকারের আর্থিক বিবৃতির সাথে সংযুক্ত করে সংসদে উপস্থাপনের জন্য অর্থমন্ত্রীর নিকট প্রেরণ করবেন।
সুপ্রিম কোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের অনুকূলে বাজেটে বরাদ্দকৃত অর্থ পুনঃউপযোজনের (Reappropriation) সব ক্ষমতা প্রধান বিচারপতির থাকবে।
এই অধ্যাদেশ জারির ফলে বিচার বিভাগের ফাইন্যান্সিয়াল ও অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অটোনমি (Autonomy) প্রতিষ্ঠিত হলো, যা দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত ছিল।