ইউরোপীয় ফুটবলে এই মুহূর্তে আর্সেনাল এক আতঙ্কের নাম। কদিন আগেই বায়ার্ন মিউনিখের মতো জায়ান্টদের অপরাজেয় যাত্রা থামিয়ে দিয়ে নিজেদের শক্তির জানান দিয়েছিল মিকেল আর্তেতার শিষ্যরা। ফর্মের তুঙ্গে থাকা সেই আর্সেনাল যখন ধুঁকতে থাকা চেলসির মুখোমুখি হয়, তখন স্টামফোর্ড ব্রিজে গানারদের জয়ই ছিল অবধারিত বাজি। তার ওপর প্রথমার্ধেই লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন চেলসির মিডফিল্ড জেনারেল মোইসেস কাইসেদো। কিন্তু ফুটবলের অনিশ্চয়তার সৌন্দর্য ফের মঞ্চস্থ হলো রোববার। ১০ জনের চেলসির অদম্য মানসিকতার কাছে হোঁচট খেল শিরোপাপ্রত্যাশী আর্সেনাল।
রোববার (৩০ নভেম্বর) প্রিমিয়ার লিগের হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে স্টামফোর্ড ব্রিজে ১-১ গোলে ড্র নিয়ে মাঠ ছেড়েছে দুই লণ্ডন জায়ান্ট। চেলসির হয়ে ট্রেভো শ্যালোভাহ লিড নেওয়ার পর আর্সেনালকে সমতায় ফেরান স্প্যানিশ মিডফিল্ড তারকা মিকেল মেরিনো। এই ড্রয়ের ফলে লিগ টেবিলে আর্সেনাল শীর্ষস্থান ধরে রাখলেও, ব্যবধান কমিয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে উঠে এসেছে পেপ গার্দিওলার ম্যানচেস্টার সিটি।
লন্ডন ডার্বির নাটকীয় মোড় ও ‘ভিএআর’ নাটক
ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখলে আর্সেনাল এগিয়ে থাকলেও, কাউন্টার অ্যাটাকে চেলসি ছিল অত্যন্ত ধারালো। তবে ম্যাচের ৩৮তম মিনিটে বড় ধাক্কা খায় স্বাগতিকরা। আর্সেনালের মিকেল মেরিনোকে কড়া ট্যাকেল করে বসেন চেলসির মাঝমাঠের ইঞ্জিন মোইসেস কাইসেদো। রেফারি প্রথমে ইয়লো কার্ড দেখালেও, পরবর্তীতে VAR (Video Assistant Referee) প্রযুক্তির সহায়তায় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে সরাসরি লাল কার্ড (Red Card) দেখানো হয় কাইসেদোকে।
ধারণা করা হচ্ছিল, একজন খেলোয়াড় কমে যাওয়ায় চেলসি রক্ষণাত্মক খোলসে ঢুকে যাবে এবং আর্সেনাল সহজেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেবে। কিন্তু এনজো মারেস্কার দল সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে দুর্দান্তভাবে ম্যাচে ফিরে আসে। প্রথমার্ধে বল পজিশনে পিছিয়ে থেকেও চেলসি ১১টি শট নেয়, যার মধ্যে ৫টি ছিল অন টার্গেট। অন্যদিকে, গানারদের ৮টি শটের ৫টি লক্ষ্যে ছিল।
১০ জনের চেলসির প্রতিরোধ এবং সেট-পিস দক্ষতা
বিরতির পর একজন কম নিয়েও চেলসি যে আগ্রাসী ফুটবল উপহার দিয়েছে, তা ছিল প্রশংসনীয়। ৪৭তম মিনিটে পেদ্রোর একটি দুর্দান্ত হেড অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় ঠেকিয়ে দেন আর্সেনাল গোলরক্ষক ডেভিড রায়া। তবে সেই যাত্রায় রক্ষা পেলেও, ঠিক তার পরের মুহূর্তেই গোল হজম করে আর্সেনাল।
রিসে জেমসের নেওয়া নিখুঁত কর্নার থেকে ভেসে আসা বলে মাথা ছুঁইয়ে বল জালে জড়ান ট্রেভো শ্যালোভাহ। এই গোলের মাধ্যমে চেলসি আবারও প্রমাণ করল চলতি মৌসুমে Set-Piece বা সেট-পিসে তারা কতটা ভয়ংকর। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এই মৌসুমে লিগে কর্নার থেকে এটি চেলসির সপ্তম গোল। আর্সেনাল ৮টি গোল করে এই তালিকায় তাদের ঠিক ওপরেই অবস্থান করছে।
আর্সেনালের কামব্যাক এবং শিরোপা সমীকরণ
চেলসির লিড বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। গোল হজমের পর আর্সেনাল আক্রমণের ধার আরও বাড়িয়ে দেয়। ম্যাচের ৫৯তম মিনিটে ইংলিশ তারকা বুকায়ো সাকার মাপা ক্রসে হেড করে দলকে সমতায় ফেরান সেই মিকেল মেরিনো। বাকি সময়ে দুই দলই একাধিক সুযোগ তৈরি করলেও, ফিনিশিংয়ের অভাবে আর কোনো গোল দেখা যায়নি।
স্টামফোর্ড ব্রিজে এই ড্রয়ের ফলে চেলসির বিপক্ষে টানা আট ম্যাচে অপরাজিত থাকার রেকর্ড অক্ষুণ্ন রাখল আর্সেনাল, যার মধ্যে পাঁচটিতেই জয় ছিল তাদের। তবে রোববারের এই ড্র শিরোপা দৌড়ে কিছুটা হলেও পিছিয়ে দিল আর্তেতার দলকে, আর অক্সিজেন যোগাল ম্যানচেস্টার সিটিকে।
১৩ ম্যাচ শেষে ৯ জয় ও ৩ ড্রয়ে ৩০ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের শীর্ষে আছে আর্সেনাল। অন্যদিকে, আগের দিন জয় পাওয়া ম্যানচেস্টার সিটি ২৫ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে। আর্সেনালের পয়েন্ট হারানোয় তাদের সাথে সিটির ব্যবধান কমল। অন্যদিকে, এক পয়েন্ট কম নিয়ে (২৪ পয়েন্ট) তৃতীয় স্থানে থেকে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে চেলসি। প্রিমিয়ার লিগের এই ইঁদুর-দৌড় যে মৌসুমের শেষ পর্যন্ত গড়াবে, রোববারের ম্যাচটি ছিল তারই এক স্পষ্ট ইঙ্গিত।