ভিওয়ানি, হরিয়ানা: নারীর শ্লীলতাহানির প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেন জাতীয় স্তরের স্বর্ণপদকজয়ী বডিবিল্ডার রোহিত ধনখড়। গত শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) রাতে হরিয়ানার ভিওয়ানি জেলার একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। প্রতিবাদ করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লেভেল ক্রসিংয়ের সামনে প্রায় ২০ জন দুষ্কৃতীর একটি দল তাঁকে ঘিরে ধরে লাঠি ও রড দিয়ে বেধড়ক মারধর করে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালেই তাঁর মৃত্যু হয়।
মৃত রোহিত ধনখড় হরিয়ানার রোহতক জেলার হুমায়ুনপুর গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তাঁর এই নৃশংস মৃত্যুতে বর্তমানে গোটা এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও শোকের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
শুরুটা হয়েছিল প্রতিবাদ দিয়ে
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার দিন রোহিত তাঁর বন্ধু যতীনকে সঙ্গে নিয়ে ভিওয়ানির ওই বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়েছিলেন। অভিযোগ, বরযাত্রীর কয়েকজন যুবক কনের বাড়িতে এসে উপস্থিত নারীদের সঙ্গে অত্যন্ত অশালীন আচরণ শুরু করেন। তাদের আপত্তিজনক মন্তব্য ও চিৎকারে অনুষ্ঠানের পরিবেশ নষ্ট হয়।
শব্দ শুনে ন্যাশনাল গোল্ড মেডালিস্ট রোহিত এগিয়ে যান এবং ঘটনার কারণ জানতে চান। নারীরা তাঁকে বিস্তারিত অভিযোগ জানালে, তিনি উত্ত্যক্তকারী যুবকদের অবিলম্বে ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে যেতে বলেন। প্রথমে এই নিয়ে সামান্য গণ্ডগোল তৈরি হলেও, রোহিতের দৃঢ় অবস্থান এবং তাঁর অ্যাথলিট সুলভ ব্যক্তিত্বের কারণে পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দেওয়া হয় এবং অনুষ্ঠান শেষ হয়।
ambushed: ২০ জনের দলবলের নৃশংস হামলা
অনুষ্ঠান শেষে রোহিত ও তাঁর বন্ধু যতীন নিজেদের মোটরবাইকে করে বাড়ির পথে রওনা হন। অভিযোগ, কিছু দূর যাওয়ার পরই প্রায় ২০ জন যুবকের একটি সুসংগঠিত দল তাঁদের পথরোধ করে। হামলাকারীদের হাতে লাঠি, লোহার রড ও ধারালো অস্ত্র ছিল।
বন্ধুরা পালাতে চেষ্টা করলে দুর্ভাগ্যজনকভাবে লেভেল ক্রসিংয়ের গেট নামানো থাকায় তারা আটকে পড়েন। সেই সুযোগে যতীন কোনওক্রমে পালাতে সক্ষম হলেও হামলাকারীরা জাতীয় স্তরের এই ক্রীড়াবিদকে ধরে ফেলে। অভিযোগ, এরপর রোহিতকে দীর্ঘক্ষণ ধরে নৃশংসভাবে মারধর করা হয়। মারের চোটে গুরুতর জখম হয়ে তিনি নিস্তেজ হয়ে পড়েন।
হামলাকারীরা চলে যাওয়ার পর বন্ধু যতীন ফিরে এসে গুরুতর আহত অবস্থায় রোহিতকে উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু আঘাত গুরুতর হওয়ায় চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন রোহিত।
জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত বডিবিল্ডার: জিম মালিকের ট্র্যাজেডি
পেশাগত জীবনে অত্যন্ত সফল রোহিত ধনখড় শুধুমাত্র একজন জাতীয় স্তরের বডিবিল্ডার হিসাবেই পরিচিত ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন স্বাবলম্বী যুবক এবং পরিবারের একমাত্র অবলম্বন। ২০১৭ সালে বাবার মৃত্যুর পর থেকে তিনি তাঁর মা ও ছোট বোনের দেখাশোনা করতেন। রোহতকের সেক্টর-৪–এ তাঁর নিজস্ব একটি জিমন্যাশিয়াম (Gym) রয়েছে।
তাঁর সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে ২০১৮ সালে, যখন তিনি জাতীয় প্রতিযোগিতায় স্বর্ণপদক জেতেন। সেই সময়কার মুখ্যমন্ত্রী মনোহরলাল খট্টর তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মানিত করেছিলেন। এমন একজন প্রতিভাবান ও সমাজসচেতন যুবকের করুণ পরিণতিতে এলাকার মানুষ স্তম্ভিত।
পুলিশি তদন্ত ও জনরোষ
রোহিতের হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার পরই পুলিশ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। হামলাকারী দলের পরিচয় শনাক্ত করতে আশেপাশের সিসিটিভি ফুটেজ (CCTV footage) খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে। তবে প্রকাশ্যে এভাবে একজন ন্যাশনাল হিরোকে পিটিয়ে মারার ঘটনায় হরিয়ানায় তীব্র উত্তেজনা ও জনরোষ সৃষ্টি হয়েছে।