• খেলা
  • ‘মেসি’ হতে চান না ইয়ামাল: কিংবদন্তির ছায়া সরিয়ে নিজের সাম্রাজ্য গড়ার প্রত্যয়

‘মেসি’ হতে চান না ইয়ামাল: কিংবদন্তির ছায়া সরিয়ে নিজের সাম্রাজ্য গড়ার প্রত্যয়

খেলা ১ মিনিট পড়া
‘মেসি’ হতে চান না ইয়ামাল: কিংবদন্তির ছায়া সরিয়ে নিজের সাম্রাজ্য গড়ার প্রত্যয়

লিওনেল মেসির উত্তরসূরি হিসেবে বিশ্বজুড়ে তুমুল আলোচনা থাকলেও স্প্যানিশ ‘বিস্ময়বালক’ লামিনে ইয়ামালের সাফ কথা—তুলনা নয়, নিজের খেলা দিয়েই বিশ্বমঞ্চে স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করতে চান তিনি; লক্ষ্য ২০২৬ বিশ্বকাপ ও নতুন ইতিহাস।

বার্সেলোনার সেই একই আঁতুড়ঘর, লা মাসিয়া। আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসির মতোই বাঁ পায়ের জাদুকরী স্পর্শ এবং রাইট উইং থেকে আক্রমণের ঝড় তোলার ক্ষমতা। ফুটবল বিশ্বের সমীকরণটা তাই খুব সহজ ছিল—লামিনে ইয়ামালই বার্সেলোনার পরবর্তী ‘মেসি’। কিন্তু যাকে ঘিরে এই ‘Next Messi’ বা ‘ভবিষ্যতের মহাতারকা’র ট্যাগ, সেই ১৮ বছর বয়সী স্প্যানিশ সেনসেশন পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, তিনি কারও ছায়া হয়ে থাকতে চান না। তিনি হতে চান শুধুই লামিনে ইয়ামাল।

আর্জেন্টাইন কিংবদন্তির সঙ্গে প্রতিনিয়ত তুলনা এবং প্রত্যাশার পারদ ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী হওয়াটা ইয়ামালের জন্য আর স্বস্তিদায়ক নয়। দুজনই বার্সেলোনার একাডেমি গ্র্যাজুয়েট হওয়ায় খেলার ধরনে মিল থাকাটা ‘Technical’ দৃষ্টিকোণ থেকে স্বাভাবিক। তবে এই প্রজন্মের অন্যতম সেরা ‘Talent’ হিসেবে বিবেচিত ইয়ামাল দৃঢ় প্রতিজ্ঞ—তিনি অন্যের রেখে যাওয়া পথে হাঁটবেন না, বরং নিজের পায়ে নতুন পথ তৈরি করবেন।

বিস্ময়বালকের অভাবনীয় উত্থান ও রেকর্ডের হাতছানি

মাত্র ১৫ বছর বয়সে বার্সেলোনার সিনিয়র টিমে অভিষেকের পর থেকেই ইয়ামাল বিশ্ব ফুটবলকে চমকে দিয়েছেন। তার এই উল্কার মতো উত্থান তাকে এনে দিয়েছে একের পর এক সাফল্য। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই এই স্প্যানিশ ফরোয়ার্ডের শোকেসে জমা হয়েছে লা লিগা এবং মর্যাদাপূর্ণ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ (Euro) শিরোপা। ব্যক্তিগত অর্জনেও তিনি পিছিয়ে নেই; জিতেছেন ‘গোল্ডেন বয়’ খ্যাত কোপা ট্রফি। ফুটবল বোদ্ধাদের ধারণা, যেভাবে তিনি পারফর্ম করছেন, তাতে খুব শীঘ্রই ‘Ballon d'Or’ জয় করাটা কেবল সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। যদিও মেসির আটটি ব্যালন ডি’অর জয়ের অবিশ্বাস্য রেকর্ড ছোঁয়া প্রায় অসম্ভব, তবুও ইয়ামালের ‘Career Trajectory’ তাকে সেই উচ্চতার দিকেই ইঙ্গিত করছে।

স্বকীয়তার সন্ধানে: তুলনা নয়, সম্মান

সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইয়ামাল নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি বলেন, “লিওনেল মেসি সর্বকালের সেরা ফুটবলার (GOAT), এ নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু আমি মেসি হতে চাই না, তার মতো খেলার চেষ্টাও করতে চাই না। এমনকি বার্সেলোনায় ১০ নম্বর জার্সির যে ভার, সেটাও আমি এখনই নিজের কাঁধে নিতে চাই না। আমি চাই মানুষ আমাকে লামিনে ইয়ামাল হিসেবেই চিনুক।”

মেসির প্রতি অগাধ সম্মান রেখে তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা যদি কখনো একে অপরের মুখোমুখি হই, তবে পরস্পরের প্রতি পূর্ণ সম্মান থাকবে। কিন্তু দিনশেষে আমি আমার নিজের পথটাই অনুসরণ করতে চাই।”

অনুপ্রেরণা যখন কৌশল বদলায়

মেসির মতো হতে না চাইলেও, মেসির ফুটবল দর্শন যে তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে, তা অস্বীকার করেননি ইয়ামাল। শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, “ছোটবেলায় আমি মেসির পাসিংয়ের ভিডিওগুলো খুব মন দিয়ে দেখতাম। অন্য খেলোয়াড়রাও ভালো পাস দিত, কিন্তু মেসির প্রতিটি পাসই ছিল যেন একেকটি ‘Goal Scoring Opportunity’। ড্রিবলিংয়ের চেয়ে তার ‘Game Reading’ এবং পাসিং আমাকে বেশি আকৃষ্ট করত। মজার বিষয় হলো, একাডেমিতে আমি খুব একটা ড্রিবলার ছিলাম না; বরং গোল করা এবং প্রচুর দৌড়ানোর দিকেই আমার মনোযোগ ছিল।”

বর্তমানে অবশ্য ইয়ামালের খেলার অন্যতম প্রধান অস্ত্রই হলো তার ড্রিবলিং। ডিফেন্ডারদের বোকা বানিয়ে বল নিয়ে বের হয়ে আসার দক্ষতায় অনেকেই তার মধ্যে মেসির ছায়া খুঁজে পান।

‘হাইপ’ ও মানসিক দৃঢ়তা

উজ্জ্বল ভবিষ্যতের হাতছানি থাকলেও ইয়ামাল নিজের চারপাশের মিডিয়া ‘Hype’ বা অতিরিক্ত প্রশংসায় ভেসে যেতে নারাজ। তিনি বিশ্বাস করেন, অতিরিক্ত প্রত্যাশা একজন খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তার ভাষায়, “আমি নিজের জন্য কোনো নির্দিষ্ট প্রত্যাশা বা ‘Expectation’ সেট করি না। আমি শুধু খেলাটা উপভোগ করতে চাই। প্রত্যাশা পূরণ হলে মনে হয় আর কিছু পাওয়ার নেই, আর না হলে হতাশা গ্রাস করে। আমার কাছে ফুটবল হলো এমন এক মাধ্যম, যা আমাকে সব সমস্যা ভুলিয়ে দেয়। মাঠে নামলে আমার মাথায় শুধু খেলাটাই থাকে।”

পরিসংখ্যান নয়, বিনোদনই মূল লক্ষ্য

পেশাদার ফুটবলে যেখানে সবাই পরিসংখ্যানের পেছনে ছোটে, সেখানে ইয়ামালের দর্শন কিছুটা ভিন্ন। তিনি বলেন, “আমার লক্ষ্য সব রেকর্ড ভাঙা নয়, লাখ লাখ গোল করা বা হাজার হাজার ম্যাচ খেলাও নয়। আমি একজন অ্যাথলেট, যে খেলাটা উপভোগ করতে চায়। আমি চাই বাচ্চারা আমাকে দেখে অনুপ্রাণিত হোক। দিনশেষে আমার লক্ষ্য একটাই—মানুষ যেন আমার খেলা দেখে আনন্দ পায়, ফুটবলে যেন প্রকৃত বিনোদন খুঁজে পায়।”

মাঠের লড়াকু মানসিকতা

মাঠে ইয়ামালের মানসিকতা বা ‘Mentality’ থাকে ইস্পাত কঠিন। তিনি বলেন, “প্রতিপক্ষের ডিফেন্সে যদি তিনজন খেলোয়াড়ও থাকে, আমি ড্রিবল করবই। আমার আত্মবিশ্বাস বা ‘Self-Confidence’ খুব উঁচুতে থাকে। বল কেড়ে নিলেও আমার সমস্যা নেই, আমি আবার চেষ্টা করি। যদি প্রতিপক্ষ দেখে আমি থেমে যেতাম, তবে আমি আজকের এই ইয়ামাল হতে পারতাম না।”

চলতি মৌসুমে বার্সেলোনার জার্সিতে ইয়ামালের পরিসংখ্যান তার কথারই প্রতিধ্বনি করে। ১৪ ম্যাচে ৭টি গোল এবং ৭টি অ্যাসিস্ট—তার এই ‘High Performance’ বার্সেলোনাকে লা লিগার পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে রেখেছে, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদকেও পেছনে ফেলেছে কাতালান ক্লাবটি। সামনেই ২০২৬ বিশ্বকাপ, স্পেনের হয়ে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন এখন এই তরুণের চোখেমুখে। মেসির ছায়া থেকে বেরিয়ে ইয়ামাল যে ফুটবলের নতুন সাম্রাজ্য গড়তে প্রস্তুত, তা তার খেলা আর কথায় এখন স্পষ্ট।

Tags: la liga football news lionel messi fc barcelona lamine yamal wonderkid spanish football sports journalism kopa trophy euro 2024