অধিকৃত পশ্চিম তীরের জেনিনে দুই নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিকে আটকের পর খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যার ঘটনাকে ‘Cold-blooded execution’ বা ঠান্ডা মাথায় মৃত্যুদণ্ড হিসেবে অভিহিত করেছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ। সেই রেশ না কাটতেই বিশ্ববিবেককে স্তম্ভিত করে দিয়ে ওই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ইউনিটের কমান্ডারকে পুরস্কৃত করল ইসরাইল। দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ব্যক্তিগতভাবে ওই অফিসারকে পদোন্নতি বা ‘Promotion’ দিয়েছেন।
রোববার (৩০ নভেম্বর) ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ‘হারেৎজ’-এর বরাতে সোমবার (১ ডিসেম্বর) তুরস্কের সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে। ভিডিও ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান সামনে আসার মাত্র একদিনের মাথায় এমন সিদ্ধান্ত ইসরাইলি প্রশাসনের চরমপন্থাকেই ফের সামনে আনল।
ভিডিও ফাঁসের পরেই ‘অস্বাভাবিক’ পুরস্কার
ইসরাইলি বাহিনী কর্তৃক দুই ফিলিস্তিনিকে হত্যার একটি লোমহর্ষক ভিডিও ফুটেজ বা ‘Footage’ প্রকাশ্যে আসার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই পদোন্নতির ঘোষণা আসে। হারেৎজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মন্ত্রী বেন-গভির নিজে ওই ইউনিটের ঘাঁটিতে গিয়ে কমান্ডারকে পদোন্নতির খবর জানান। সাধারণত পুলিশ বা সামরিক বাহিনীতে নিম্ন পদমর্যাদার কোনো অফিসারকে খোদ মন্ত্রীর এভাবে গিয়ে পদোন্নতি দেওয়াটা ‘Protocol’ বহির্ভূত এবং অত্যন্ত ‘Unusual’ বা অস্বাভাবিক ঘটনা। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করে সেনাদের মনোবল বাড়াতে এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি বা ‘Culture of Impunity’ প্রতিষ্ঠা করতেই এই পদক্ষেপ নিয়েছেন কট্টরপন্থী এই নেতা।
কী ঘটেছিল সেই নারকীয় মুহূর্তে?
গত বৃহস্পতিবার জেনিনে ইসরাইলি অভিযানের সময় এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, নিহতরা হলেন ২৬ বছর বয়সী মনতাসির আবদুল্লাহ এবং ৩৭ বছর বয়সী ইউসুফ আসাসা।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জিজ্ঞাসাবাদের সময় তদন্তকারীরা অফিসারদের সামনে সেই ‘Incriminating Footage’ উপস্থাপন করেন। ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যায়, জেনিনের একটি বাড়ি থেকে ওই দুই ফিলিস্তিনি হাত উঁচু করে বেরিয়ে আসছেন। অর্থাৎ তারা আত্মসমর্পণ করছিলেন এবং তাদের কাছে কোনো অস্ত্র ছিল না। এরপর ইসরাইলি অফিসাররা তাদের মাটিতে শুয়ে পড়ার নির্দেশ দেন। নির্দেশ মেনে তারা মাটিতে শুয়ে পড়লে, একজন অফিসার খুব কাছ থেকে (Point-blank range) তাদের গুলি করে হত্যা করেন।
তদন্তের মাঝেই ‘Open Support’
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এই ঘটনাকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে আখ্যায়িত করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। ঘটনার পর একটি ফৌজদারি তদন্ত বা ‘Criminal Investigation’ শুরু হলেও, তা তোয়াক্কা করেননি বেন-গভির। শুক্রবার তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও পোস্ট করেন, যেখানে দেখা যায় তিনি অভিযুক্ত ইউনিট কমান্ডারকে জড়িয়ে ধরছেন।
ভিডিওবার্তায় বেন-গভির ওই ইউনিটের প্রতি তার পূর্ণ সমর্থন বা ‘Full Support’ ব্যক্ত করেন। তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় একজন মন্ত্রীর এমন আচরণ বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার শামিল বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মীরা। বেন-গভিরের এই পদক্ষেপ ফিলিস্তিনিদের জীবনের নিরাপত্তার সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে এবং পশ্চিম তীরে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।