ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে ওয়াশিংটনের অবস্থান এখন আর কেবল কূটনৈতিক চাপ বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; পরিস্থিতি মোড় নিচ্ছে সরাসরি সামরিক সংঘাতের দিকে। লাতিন আমেরিকার এই সমাজতান্ত্রিক দেশটিতে এবার সরাসরি স্থল অভিযান বা ‘Ground Operation’-এর ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। সমুদ্রপথে মার্কিন নৌবাহিনীর বিতর্কিত অভিযানের রেশ কাটতে না কাটতেই ট্রাম্পের এই ঘোষণা কারাকাসের সঙ্গে ওয়াশিংটনের উত্তেজনাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
মঙ্গলবার (২ ডিসেম্বর) মন্ত্রিসভার এক জরুরি বৈঠকে ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, মাদকবিরোধী অভিযান বা ‘Counter-Narcotics Operation’ এখন আর কেবল জলসীমায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। ‘মাদক সন্ত্রাসীরা’ (Narcoterrorists) যেখানেই আত্মগোপন করবে—হোক তা সমুদ্র বা ভেনেজুয়েলার দুর্গম স্থলভাগ—সেখানেই আঘাত হানবে মার্কিন বাহিনী।
‘মাদক সন্ত্রাস’ নির্মূলে জিরো টলারেন্স: লক্ষ্য এবার কারাকাস
মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত আক্রমণাত্মক সুরে ভেনেজুয়েলায় অভিযানের পরিধি বিস্তারের ঘোষণা দেন। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “মাদকবিরোধী অভিযান এখন শুধু সমুদ্রপথেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। কারাকাসের যে অঞ্চলেই মাদক সন্ত্রাসীরা অবস্থান করবে, সেই অঞ্চলকেই হামলার ‘লেজিটিমেট টার্গেট’ (Legitimate Target) বা বৈধ লক্ষ্যবস্তু বানানো হবে।”
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ট্রাম্প প্রশাসন যে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত, তা পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, যে দেশ বা ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচারের সঙ্গে যুক্ত থাকবে, তাদের কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কথা বলা হলেও, এর মূল লক্ষ্য ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সরকারকে উৎখাত করা।
‘ডাবল-ট্যাপ’ বিতর্ক ও পেন্টাগনের ব্যাখ্যা
সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার সন্দেহভাজন মাদকবাহী নৌকা লক্ষ্য করে মার্কিন নৌবাহিনীর ‘ডাবল-ট্যাপ’ (Double-tap) হামলা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। দ্বিতীয় দফার এই হামলা নিয়ে যখন বিতর্ক তুঙ্গে, তখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি কেবল প্রথম দফার সফল অভিযান সম্পর্কে অবগত ছিলেন।
ট্রাম্পের সুরেই কথা বলেছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী বা ‘ডিফেন্স সেক্রেটারি’ পিট হেগসেথ। তিনি জানান, প্রথম ধাপের হামলাটি ট্রাম্প সরাসরি পর্যবেক্ষণ করলেও পরবর্তী অংশটি তার অগোচরেই ঘটেছে। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, নৌবাহিনীর একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা (High-ranking Official) ওই দ্বিতীয় হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন, যা ছিল ‘অপারেশনাল প্রটোকল’-এর অংশ। তবে এই ব্যাখ্যা ভেনেজুয়েলার ক্ষোভ প্রশমনে কতটুকু কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
পর্দার আড়ালে ফোনালাপ: ১৫ মিনিটের আল্টিমেটাম
প্রকাশ্য হুমকির পাশাপাশি কূটনৈতিক চ্যানেলেও মাদুরোকে চরম বার্তা দিয়েছেন ট্রাম্প। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ট্রাম্প ও মাদুরোর মধ্যকার সাম্প্রতিক এক গোপন ফোনালাপের চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, দুই নেতার মধ্যে প্রায় ১৫ মিনিট কথা হয়, যেখানে ট্রাম্প মাদুরোকে এক সপ্তাহের সময়সীমা বেঁধে দেন।
ট্রাম্প সরাসরি মাদুরোকে নির্দেশ দেন, এক সপ্তাহের মধ্যে পদত্যাগ করে সপরিবারে দেশ ত্যাগ করতে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র তাকে নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছানোর বা ‘Safe Passage’-এর নিশ্চয়তা দেবে। ট্রাম্পের এই প্রস্তাব ছিল মূলত একটি অলিখিত আল্টিমেটাম।
মাদুরোর শর্ত ও ট্রাম্পের প্রত্যাখ্যান: ভেস্তে গেল সমঝোতা
রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ফোনালাপে মাদুরো দেশ ত্যাগে সম্মত হতে কিছু কঠোর শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেন। তিনি ও তার পরিবারের সদস্যদের জন্য ‘পূর্ণ আইনি দায়মুক্তি’ (Full Legal Immunity) দাবি করেন। একই সঙ্গে, তার ওপর আরোপিত যুক্তরাষ্ট্রের সকল ‘Sanction’ বা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (ICC) তার বিরুদ্ধে চলমান ‘Human Rights Violation’ বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের মামলাগুলো তুলে নেয়ার দাবি জানান।
শুধু নিজের জন্য নয়, মাদুরো তার প্রশাসনের আরও ১০০ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানান, যাদের বিরুদ্ধে মাদক চোরাচালান ও ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
তবে ট্রাম্প মাদুরোর এই দীর্ঘ তালিকা ও দায়মুক্তির আবদার সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, হাতে মাত্র এক সপ্তাহ সময় আছে; এর মধ্যেই মাদুরোকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। গত শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) সেই আল্টিমেটামের সময়সীমা শেষ হয়েছে। সময় শেষ হওয়ার পরপরই শনিবার (২৯ নভেম্বর) ভেনেজুয়েলার আকাশসীমা অবৈধ ঘোষণা করেন ট্রাম্প, যা আসন্ন ঝড়েরই পূর্বাভাস। রোববার ট্রাম্প ফোনালাপের বিষয়টি স্বীকার করলেও বিস্তারিত কৌশলগত কারণে গোপন রাখেন।