• দেশজুড়ে
  • বাল্যবিয়ের ‘হটস্পট’ রাজশাহী: ১৮ পেরোনোর আগেই ৬৭ শতাংশ কিশোরীর বিয়ে, বাড়ছে ডিভোর্স ও প্রাণঘাতী স্বাস্থ্যঝুঁকি

বাল্যবিয়ের ‘হটস্পট’ রাজশাহী: ১৮ পেরোনোর আগেই ৬৭ শতাংশ কিশোরীর বিয়ে, বাড়ছে ডিভোর্স ও প্রাণঘাতী স্বাস্থ্যঝুঁকি

দেশজুড়ে ১ মিনিট পড়া
বাল্যবিয়ের ‘হটস্পট’ রাজশাহী: ১৮ পেরোনোর আগেই ৬৭ শতাংশ কিশোরীর বিয়ে, বাড়ছে ডিভোর্স ও প্রাণঘাতী স্বাস্থ্যঝুঁকি

ইউনিসেফ ও বিবিএস-এর জরিপে উঠে এল ভয়াবহ চিত্র; প্রেমঘটিত পলায়ন ও পারিবারিক অসচেতনতায় ধ্বংস হচ্ছে হাজারও কিশোরীর ভবিষ্যৎ; পুলিশ বলছে চলছে কঠোর ‘লিগ্যাল অ্যাকশন’

উন্নয়নের নানা সূচকে দেশ এগিয়ে গেলেও রাজশাহী বিভাগে বাল্যবিয়ের হার বা ‘আর্লি ম্যারেজ রেট’ যেন থামছেই না। বরং সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, সারাদেশের মধ্যে বাল্যবিয়ের দৌরাত্ম্যে বর্তমানে শীর্ষে অবস্থান করছে এই বিভাগ। আর্থ-সামাজিক নানা পদক্ষেপের পরেও এখানে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য হচ্ছে ৬৭ শতাংশ কিশোরী। এর ফলে কেবল অপরিণত বয়সে গর্ভধারণ বা ‘আর্লি প্রেগন্যান্সি’র ঝুঁকিই বাড়ছে না, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদ এবং পারিবারিক সহিংসতার ঘটনাও।

ইউনিসেফ এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS)-এর চলতি মাসের সদ্য প্রকাশিত জরিপে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি একটি ভয়াবহ ‘সোশ্যাল ক্রাইসিস’ বা সামাজিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত।

প্রেম, পলায়ন ও পরিবারের হাহাকার: একটি বাাস্তব চিত্র

পরিসংখ্যানের এই শুষ্ক সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারও দীর্ঘশ্বাসের গল্প। এমনই একটি ঘটনা রাজশাহী জেলার পুঠিয়া উপজেলার। স্কুলছাত্রী সামিয়া (ছদ্মনাম), জন্মনিবন্ধন সনদ অনুযায়ী যার বয়স মাত্র ১৬ বছর। বয়সের আবেগে এবং পারিবারিক অসম্মতির জেরে বন্ধুর হাত ধরে ঘর ছাড়ে সে। গত ২৬ অক্টোবর থেকে মেয়েকে খুঁজে না পেয়ে দিশেহারা পরিবার থানায় মামলা দায়ের করে।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে একটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে বাবা-মা জানতে পারেন, তাদের নাবালিকা মেয়ে বিয়ে করেছে। আদরের সন্তানকে ফিরে না পেয়ে এবং তার ভবিষ্যৎ চিন্তায় এখন শুধুই আহাজারি করছেন সামিয়ার বাবা-মা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজশাহীতে সম্প্রতি পরিবারের অমতে পালিয়ে গিয়ে অল্প বয়সে বিয়ে করার প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে, যা সামাজিক অবক্ষয়েরই নামান্তর।

জরিপে উঠে আসা আঁতকে ওঠার মতো তথ্য

ইউনিসেফ ও বিবিএস-এর যৌথ জরিপের তথ্যমতে, রাজশাহী বিভাগে ১৮ বছরের নিচে মেয়েদের বিয়ের হার ৬৭ শতাংশ, যা জাতীয় গড়ের চেয়েও উদ্বেগজনকভাবে বেশি। এর মধ্যে আরও ভীতিজাগানিয়া তথ্য হলো, ১৫ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসছে প্রায় ১৩ শতাংশ শিশু।

বাল্যবিয়ের এই প্রবণতা কেবল গ্রামেই সীমাবদ্ধ নয়, শহরের শিক্ষিত সমাজেও এর ছায়া পড়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, শহরে এই হার ৫০ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে তা ৫৬ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। মূলত, দারিদ্র্য এবং সামাজিক নিরাপত্তার অভাবের পাশাপাশি ‘টিনেজ রোমান্স’ বা বয়ঃসন্ধিকালীন আবেগের কারণেও এই হার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

‘রিপ্রোডাক্টিভ হেলথ’ ঝুঁকি ও সামাজিক অস্থিরতা

বাল্যবিয়ের প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য বা ‘রিপ্রোডাক্টিভ হেলথ’-এর ওপর। জরিপ বলছে, এই বিভাগে কম বয়সে মা হওয়ার হার সবচেয়ে বেশি। শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়ার আগেই গর্ভধারণের ফলে মাতৃমৃত্যু, শিশুস্বাস্থ্যের জটিলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যা বাড়ছে।

তবে সমস্যা কেবল স্বাস্থ্যের গণ্ডিতেই আটকে নেই। বিবাহিত নারীদের মধ্যে ‘ইন্টিকেমট পার্টনার ভায়োলেন্স’ বা ঘনিষ্ঠ সঙ্গী দ্বারা নির্যাতনের শিকার হওয়ার হারও এই বিভাগে ঊর্ধ্বমুখী। অপরিণত বয়সে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নেওয়া এবং মানসিক বোঝাপড়ার অভাবে বাড়ছে দাম্পত্য কলহ। ফলে রাজশাহী বিভাগে বিবাহবিচ্ছেদ বা ‘ডিভোর্স রেট’ এবং পুরুষের বহুবিবাহের হারও অন্যান্য বিভাগের তুলনায় বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে।

কারণ ও করণীয়: যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

কেন কিছুতেই লাগাম টানা যাচ্ছে না বাল্যবিয়ের? এ প্রসঙ্গে ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট’ (এসিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক সালীমা সারোয়ার বলেন, “শিক্ষার অভাব এবং অর্থনৈতিক চাপ বা ‘ইকোনমিক প্রেসার’ বড় একটি কারণ। অনেক দরিদ্র পরিবার মেয়েকে বোঝা মনে করে দ্রুত বিয়ে দিয়ে দায়মুক্ত হতে চায়। এ ছাড়া বাবা-মায়ের উদাসীনতা এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক রীতিনীতি বা ‘সোশ্যাল নর্মস’ এই ব্যাধিকে জিইয়ে রেখেছে।”

অন্যদিকে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে তারা তৎপর রয়েছে। রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান জানান, বাল্যবিয়ে রোধে তারা কঠোর ‘লিগ্যাল অ্যাকশন’ বা আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছেন। তিনি বলেন, “কেবল আইন দিয়ে এটি বন্ধ করা সম্ভব নয়, প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা। আমরা ‘কমিউনিটি পুলিশিং’ এবং উঠান বৈঠকের মাধ্যমে বাল্যবিয়ের কুফল বা ‘নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট’ নিয়ে নিয়মিত সাধারণ মানুষের সঙ্গে আলোচনা করছি। মনে রাখতে হবে, পুরুষের বয়স ২১ এবং নারীর ১৮ বছরের নিচে হলে তা সরাসরি আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।”

Tags: women health bangladesh news legal action child marriage rajshahi division early pregnancy domestic violence unicef survey social issue divorce rate