উত্তরের হাড়কাঁপানো শীত আর ঘন কুয়াশার চাদর ভেদ করে লোকালয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছিল প্রকৃতির এক বিশাল অতিথি। কিন্তু দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার ক্লান্তি আর তীব্র শীতে শেষরক্ষা হলো না নিজের শক্তির। বৃহস্পতিবার (৪ ডিসেম্বর) দুপুরে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলায় উদ্ধার করা হয়েছে ‘Endangered Species’ বা বিপন্ন প্রজাতির একটি বিশাল আকৃতির শকুন। প্রকৃতির এই পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে একনজর দেখতে এলাকাজুড়ে পড়ে যায় হুলুস্থুল।
বাঁশঝাড়ে মিলল ক্লান্ত অতিথি
ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার পশ্চিম ধনিরাম সরকার পাড়া এলাকায়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হিমালয়ের পাদদেশ থেকে খাদ্যের সন্ধানে বা তীব্র শীতের হাত থেকে বাঁচতে শকুনটি মাইগ্রেশন বা ‘Migration’ করে এ অঞ্চলে এসেছিল। কিন্তু দীর্ঘ যাত্রাপথ এবং কনকনে ঠান্ডায় পাখিটি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে।
দুপুরের দিকে স্থানীয় বাসিন্দা জাহাঙ্গীর রহমান বাড়ির পাশের বাঁশঝাড়ের নিচে বিশাল এই পাখিটিকে পড়ে থাকতে দেখেন। ওড়ার শক্তি হারিয়ে মাটিতে ধুঁকতে থাকা শকুনটিকে তিনি সাহসিকতার সাথে উদ্ধার করেন। তিনি জানান, “পাখিটি এতটাই দুর্বল ছিল যে, কাছে গেলেও ওড়ার চেষ্টা করেনি। তাই সহজেই সেটিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে।”
সেলফি আর ভিডিওর ধুম
লোকালয়ে এমন বিশাল ও বিরল প্রজাতির পাখি উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়তেই সেখানে ভিড় জমান শত শত কৌতূহলী মানুষ। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের মধ্যে উদ্দীপনা ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেকেই বিরল এই মুহূর্তটি ধরে রাখতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন ছবি তোলা ও ভিডিও ধারণে। মুহূর্তেই সেই ছবি ছড়িয়ে পড়ে ‘Social Media’ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, যা নেটিজেনদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
প্রশাসনের ত্বরিত পদক্ষেপ ও চিকিৎসা
খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান স্থানীয় প্রশাসন এবং প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় অপরিহার্য এই পাখিটিকে বাঁচাতে শুরু হয় ‘Rescue Operation’।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোছা. দিলারা আকতার জানান, “উদ্ধার হওয়া শকুনটি অত্যন্ত বিপন্ন প্রজাতির। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের কর্মকর্তারা পাখিটিকে প্রাথমিক চিকিৎসা বা ‘First Aid’ দিয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় পরিচর্যা করেছেন।”
তিনি আরও নিশ্চিত করেন যে, পাখিটি কিছুটা সুস্থবোধ করার পর, সেটির দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা ও পুনর্বাসনের জন্য বন বিভাগের বা ‘Forest Department’-এর কর্মকর্তাদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে।
প্রকৃতির বন্ধু শকুন ও বর্তমান বাস্তবতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, শকুন প্রকৃতির ঝাড়ুদার হিসেবে পরিচিত হলেও, বর্তমানে এরা পৃথিবী থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। খাদ্যাভাব, হ্যাবিট্যাট লস বা ‘Habitat Loss’ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এরা এখন অস্তিত্ব সংকটে। স্থানীয়দের ধারণা, উদ্ধার হওয়া শকুনটি হিমালয় অঞ্চল থেকে দলছুট হয়ে বা খাদ্যের সন্ধানে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে চলে এসেছিল। প্রশাসনের এই ত্বরিত উদ্যোগ এবং স্থানীয়দের সচেতনতা ‘Wildlife Conservation’ বা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করল বলে মনে করছেন পরিবেশবাদীরা।