বিশ্বফুটবলের মহাযজ্ঞ শুরু হতে আর খুব বেশি দেরি নেই। ২০২৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সঙ্গে যৌথভাবে ‘FIFA World Cup’ আয়োজন করতে যাচ্ছে মেক্সিকো। ফুটবলপাগল এই জাতি যখন বিশ্বকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত হচ্ছে, ঠিক তখনই মেক্সিকোর অন্যতম ভেন্যু ‘Estadio Akron’ (স্তাদিও অ্যাকরন) ঘিরে উঠে এল রক্ত হিম করা এক তথ্য। স্টেডিয়ামের খুব কাছেই মাটির নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় ৫০০ ব্যাগ ভর্তি মানুষের দেহাবশেষ বা ‘Human Remains’। এই লোমহর্ষক আবিষ্কার কেবল মেক্সিকো নয়, তোলপাড় সৃষ্টি করেছে গোটা বিশ্বগণমাধ্যমে।
ফুটবল উৎসবের আড়ালে বীভৎসতা
মেক্সিকোর অন্যতম সুন্দর ও আধুনিক স্টেডিয়াম হিসেবে পরিচিত গুয়াদালাহারার ‘স্তাদিও অ্যাকরন’। ২০২৬ বিশ্বকাপে এখানে গ্রুপ পর্বের একাধিক হাই-ভোল্টেজ ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু মেক্সিকান অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘আরিস্তেগুই’ (Aristegui)-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভয়াবহ চিত্র।
রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এই স্টেডিয়াম ও তার আশেপাশের এলাকা থেকে শত শত ব্যাগভর্তি মানুষের খণ্ড-বিখণ্ড দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, সংখ্যাটি প্রায় ৫০০ ব্যাগের কাছাকাছি। উৎসবের নগরী হিসেবে পরিচিত জলিস্কো (Jalisco) যেন আজ এক অঘোষিত বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছে।
নেপথ্যে দুর্ধর্ষ ‘ড্রাগ কার্টেল’
জলিস্কো প্রদেশটি মূলত মেক্সিকোর কুখ্যাত মাদক পাচারকারী চক্র বা ‘Drug Cartel’-এর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে ‘Jalisco New Generation Cartel’ (CJNG)-এর আধিপত্য এখানে প্রশ্নাতীত। অপহরণ (Kidnapping), মাদক পাচার, মানব পাচার বা ‘Human Trafficking’ এবং প্রতিপক্ষকে নৃশংসভাবে হত্যা করা এখানকার নিত্যদিনের ঘটনা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষগুলো মূলত কার্টেল যুদ্ধের বলি হওয়া সাধারণ মানুষ বা প্রতিপক্ষ গ্যাংয়ের সদস্যদের। মেক্সিকো সরকার মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বা ‘War on Drugs’ ঘোষণা করার পর থেকেই সহিংসতা চরম আকার ধারণ করে। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে মেক্সিকোতে নিখোঁজ বা ‘Missing’ মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার ছাড়িয়েছে, যার একটি বড় অংশ এই জলিস্কো প্রদেশের।
নিরাপত্তা বনাম অর্থনৈতিক স্বার্থ
বিশ্বকাপের মতো ‘Mega Event’ আয়োজন করতে গিয়ে এখন চরম দোটানায় মেক্সিকো সরকার। একদিকে পর্যটক ও খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা বা ‘Security Protocol’ নিশ্চিত করা, অন্যদিকে দেশের ভাবমূর্তি রক্ষা।
জানা গেছে, বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে জলিস্কোতে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। স্টেডিয়াম ও শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে বসানো হচ্ছে প্রায় ৩,০০০ অত্যাধুনিক সার্ভিলেন্স ক্যামেরা। মোতায়েন করা হচ্ছে বিশেষায়িত ‘National Guard’।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। অভিযোগ উঠছে, বিশ্বকাপের আগে দেশের ‘Brand Image’ ঠিক রাখতে এবং অর্থনৈতিক লাভ বা ‘Economic Benefit’ নিশ্চিত করতে নিখোঁজদের সন্ধানে চালানো অভিযানগুলো অলিখিতভাবে বন্ধ করে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে প্রশাসন। স্থানীয় প্রশাসন চায় না, বিশ্বকাপের সময় নতুন করে কোনো গণকবর বা দেহাবশেষ উদ্ধারের খবর বিশ্বমঞ্চে নেতিবাচক প্রভাব ফেলুক।
মেক্সিকোর তিন ভেন্যু—স্তাদিও অ্যাজটেকা, মনটেরি এবং এই বিতর্কিত স্তাদিও অ্যাকরন-এ খেলা হওয়ার কথা। কিন্তু স্টেডিয়ামের ছায়ায় এমন ভয়ানক বাস্তবতার খবর প্রকাশ্যে আসার পর, ফিফা ও আয়োজকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়াটাই স্বাভাবিক। এখন দেখার বিষয়, ফুটবলের জাদুকরী মুহূর্তগুলো কি সত্যিই এই রক্তের দাগ মুছে দিতে পারবে?