চুরির প্রমাণ লোপাট করতে চোরেরা কত কিছুই না করে! কিন্তু নিউজিল্যান্ডে যা ঘটল, তা যেন হলিউডের কোনো ক্রাইম থ্রিলারের চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। প্রায় ২৪ লাখ টাকা মূল্যের হিরা ও সোনাখচিত একটি লকেট চুরি করে পালানোর উপায় না দেখে সেটি সোজা গিলে ফেলেছিলেন এক যুবক। প্রায় এক সপ্তাহ পুলিশি হেফাজতে (Police Custody) কড়া নজরদারিতে রাখার পর অবশেষে ‘প্রাকৃতিক উপায়ে’ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে সেই মহামূল্যবান রত্নটি।
শুক্রবার (৫ ডিসেম্বর) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই অদ্ভুত চুরির আদ্যোপান্ত। নিউজিল্যান্ড পুলিশ নিশ্চিত করেছে, লকেটটি উদ্ধারে কোনো অস্ত্রোপচার বা জটিল ‘Medical Intervention’-এর প্রয়োজন হয়নি।
পেটের ভেতর ‘হিরের খনি’: অবিশ্বাস্য চুরির বৃত্তান্ত
ঘটনার সূত্রপাত অকল্যান্ডের অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত প্যারট্রিজ জুয়েলার্সের (Partridge Jewellers) শোরুমে। ৩২ বছর বয়সী এক ব্যক্তি ক্রেতা সেজে সেখানে প্রবেশ করেন এবং সুযোগ বুঝে একটি বহুমূল্য লকেট সরিয়ে ফেলেন। কিন্তু দোকানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও কর্মীদের তৎপরতায় তিনি ধরা পড়ে যান। পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে, মরিয়া হয়ে চুরির আলামত নষ্ট করতে তিনি লকেটটি গিলে ফেলেন।
গ্রেপ্তারের পর থেকেই পুলিশ ওই ব্যক্তিকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছিল। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, যেহেতু চুরিকৃত বস্তুটি তখনো সন্দেহভাজনের শরীরের ভেতরেই ছিল, তাই ‘Evidence Recovery’-র জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া তাদের কোনো উপায় ছিল না। দীর্ঘ প্রায় এক সপ্তাহ অপেক্ষার পর, শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়ায় (Natural Process) লকেটটি বেরিয়ে আসে এবং পুলিশ তা জব্দ করে।
কী ছিল সেই ‘অক্টোপাস ডিমে’?
চুরি যাওয়া লকেটটি সাধারণ কোনো গহনা ছিল না। এটি বিখ্যাত ফেবার্গে এগ (Fabergé egg)-এর আদলে তৈরি একটি মাস্টারপিস, যার বাজারমূল্য (Market Value) ৩৩ হাজার ৫৮৫ নিউজিল্যান্ড ডলার—বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ২৩ লাখ ৭৯ হাজার টাকার সমান।
জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, লকেটটির নাম ‘অক্টোপাস এগ’। ১৯৮৩ সালের জনপ্রিয় জেমস বন্ড মুভি ‘অক্টোপাসি’ (Octopussy) থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এটি ডিজাইন করা হয়েছিল। এর রাজকীয় গঠনের বিবরণ শুনলে যে কারোরই চোখ কপালে উঠবে:
লকেটটিতে বসানো রয়েছে ৬০টি ঝকঝকে সাদা হীরা (White Diamonds)।
এর শোভা বাড়িয়েছে ১৫টি নীলকান্তমণি (Blue Sapphires)।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, লকেটটি খুললে এর ভেতরে ১৮ ক্যারেট সোনার তৈরি একটি ক্ষুদ্রাকৃতির অক্টোপাস দেখা যায়।
এমন নিখুঁত ও শৌখিন ‘Craftsmanship’-এর নিদর্শনটি পেটের ভেতর চলে যাওয়ায় অনেকেই এর ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা করেছিলেন। তবে প্যারট্রিজ জুয়েলার্স জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া লকেটটি এখন নির্মাতাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে প্রয়োজনীয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও পরীক্ষার জন্য।
চোরের বিচিত্র ‘পোর্টফোলিও’
যিনি এই কাণ্ড ঘটিয়েছেন, সেই ৩২ বছর বয়সী যুবকের বিরুদ্ধে এটিই একমাত্র অভিযোগ নয়। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে তার চুরির বিচিত্র সব ইতিহাস। পুলিশ জানায়, এই ঘটনার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে, ১২ নভেম্বর তিনি একই জুয়েলারি শপ থেকে একটি আইপ্যাড চুরি করেছিলেন।
মজার বিষয় হলো, হিরে জহরত চুরির পাশাপাশি ছিঁচকে চুরিতেও তার নাম রয়েছে। হিরের লকেট চুরির মাত্র একদিন পর, একটি ব্যক্তিগত বাসা থেকে ১০০ নিউজিল্যান্ড ডলার মূল্যের ‘ক্যাট লিটার’ (বিড়ালের মলমূত্র ত্যাগের বালু) এবং মাছি তাড়ানোর ওষুধ (Flea Control Products) চুরি করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
আগামী ৮ ডিসেম্বর এই ‘সিরিয়াল চোর’-কে ফের আদালতে (Court) হাজির করা হবে। তার বিরুদ্ধে একাধিক চুরির মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে ২৪ লাখ টাকার লকেট গিলে ফেলার এই ঘটনা নিউজিল্যান্ডের অপরাধ জগত এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন অন্যতম আলোচনার বিষয়।