কূটনৈতিক আলোচনার টেবিল থেকে উঠতেই ফের গর্জে উঠল বন্দুক। সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনা (Peace Talks) কোনো ফলপ্রসূ সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হওয়ার পরপরই আবারও অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত। সপ্তাহের শুরুতে দুই দেশের কূটনীতিকরা যখন উত্তেজনা প্রশমনের পথ খুঁজছিলেন, সপ্তাহান্তে সেই পথেই কাঁটা বিছাল ভারী অস্ত্রের গোলাগুলি। স্থানীয় সময় শুক্রবার (৫ ডিসেম্বর) গভীর রাতে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে তীব্র গোলাবিনিময় বা ‘Cross-border firing’-এর ঘটনা ঘটে। এই সংঘাতের দায় কেউ স্বীকার করেনি, বরং চলছে পাল্টাপাল্টি দোষারোপের রাজনীতি।
মধ্যরাতে আগুনের ফুলকি: স্পিন বোলদাক বনাম চামান
শুক্রবার গভীর রাতে সীমান্তে হঠাৎ করেই যুদ্ধের আবহ তৈরি হয়। আফগানিস্তানের কান্দাহার প্রদেশের স্পিন বোলদাক এবং পাকিস্তানের চামান সীমান্তে দুই পক্ষের মধ্যে এই সংঘর্ষ বাধে। আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের মুখপাত্র জবিহুল্লাহ মুজাহিদ সরাসরি অভিযোগের আঙুল তুলেছেন ইসলামাবাদের দিকে। তার দাবি, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কোনো উসকানি ছাড়াই কান্দাহারের স্পিন বোলদাক জেলায় হামলা চালিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সীমানা আইনের লঙ্ঘন।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের অবস্থান ঠিক উল্টো। দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের মুখপাত্র মোশাররফ জায়েদি এই ঘটনাকে আফগান বাহিনীর ‘Unprovoked attack’ বা বিনা উসকানিতে হামলা হিসেবে অভিহিত করেছেন। এক কড়া বিবৃতিতে তিনি বলেন, “আঞ্চলিক অখণ্ডতা (Territorial Integrity) ও নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ‘High Alert’ বা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।”
ভেস্তে যাওয়া আলোচনা ও ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি
সীমান্তের এই সংঘাত এমন এক সময়ে ঘটল, যখন মাত্র দুদিন আগেই সৌদি আরবে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তুরস্ক ও কাতারের মধ্যস্থতায় আয়োজিত এই ‘Diplomatic Dialogue’ কোনো সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি ছাড়াই শেষ হয়। যদিও উভয় পক্ষ একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি (Fragile Ceasefire) বজায় রাখার মৌখিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু শুক্রবার রাতের এই গোলাগুলি প্রমাণ করল যে, সেই প্রতিশ্রুতি মাঠপর্যায়ে কার্যকর হয়নি।
অবিশ্বাসের দেওয়াল ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কাবুল ও ইসলামাবাদের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। পাকিস্তান বারবার অভিযোগ করে আসছে যে, আফগান তালেবান তাদের ভূখণ্ডে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর (Militant Groups) বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না। ইসলামাবাদের দাবি, এসব গোষ্ঠী আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে।
বিপরীতে, কাবুল বরাবরই ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে তাদের আকাশসীমা লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে অযথা চাপ প্রয়োগের (Diplomatic Pressure) অভিযোগ করে আসছে। শান্তি আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর এই দোষারোপের খেলা বা ‘Blame Game’ আরও তীব্র হয়েছে। এর আগে, গত অক্টোবরের শুরুতে সীমান্ত সংঘর্ষে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন সৈন্য ও বেসামরিক নাগরিকের প্রাণহানি ঘটেছিল। বর্তমান পরিস্থিতি সেই পুরনো ক্ষতকেই নতুন করে উসকে দিল।