রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের কেবিনে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলেও, এখনই তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত উচ্চ পর্যায়ের ‘মেডিকেল বোর্ড’ জানিয়েছে, দীর্ঘ আকাশপথ পাড়ি দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত শারীরিক সক্ষমতা বা ‘ফিজিক্যাল ফিটনেস’ এখনও অর্জন করতে পারেননি সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। তবে তার সুস্থতার বিষয়ে আশাবাদী চিকিৎসকরা।
শনিবার (৬ ডিসেম্বর) এভারকেয়ার হাসপাতালে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বেগম জিয়ার সর্বশেষ ক্লিনিক্যাল কন্ডিশন তুলে ধরেন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। তিনি স্পষ্ট করে জানান, রাজনীতির চেয়ে বেগম জিয়ার জীবন ও চিকিৎসকদের পরামর্শকেই এই মুহূর্তে ‘টপ প্রায়োরিটি’ দিচ্ছে তার পরিবার ও দল।
মেডিকেল বোর্ডের আশাবাদ ও নিবিড় পর্যবেক্ষণ
দেশি ও বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ড বেগম জিয়ার চিকিৎসায় সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ডা. জাহিদ হোসেন জানান, চিকিৎসকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বেগম জিয়ার শারীরিক অবস্থার ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে। তিনি বলেন, “মেডিকেল বোর্ড সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে এবং আমরা অত্যন্ত আশাবাদী যে তিনি দ্রুতই সুস্থ হয়ে উঠবেন। তার চিকিৎসার প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ‘মনিটরিং’ করা হচ্ছে।”
লন্ডন থেকে সমন্বয় ও পারিবারিক তদারকি
বেগম জিয়ার চিকিৎসার পুরো বিষয়টি সুদূর লন্ডন থেকে নিবিড়ভাবে তদারকি করা হচ্ছে। ডা. জাহিদ জানান, বেগম জিয়ার বড় ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছেন এবং চিকিৎসকদের দেওয়া প্রতিটি ‘গাইডলাইন’ বা নির্দেশনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
বিশেষত, বেগম জিয়ার পুত্রবধূ ডা. জুবাইদা রহমান, যিনি নিজেও একজন চিকিৎসক, তিনি চিকিৎসার টেকনিক্যাল বিষয়গুলো মেডিকেল বোর্ডের সঙ্গে নিয়মিত ‘কো-অর্ডিনেট’ বা সমন্বয় করছেন। তার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানেই চিকিৎসার পরবর্তী ধাপগুলো নির্ধারণ করা হচ্ছে।
কেন বিলম্বিত হচ্ছে বিদেশযাত্রা?
বেগম জিয়াকে বিদেশে নেওয়ার বিষয়টি কেন বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে, সে বিষয়েও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন ডা. জাহিদ। তিনি জানান, উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে হলে রোগীকে দীর্ঘ সময় বিমানে অবস্থান করতে হয়। কিন্তু বেগম জিয়ার বর্তমান শারীরিক অবস্থায় ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টার দীর্ঘ ‘লং-হলে’র (Long-haul) জার্নি করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
ডা. জাহিদ বলেন, “বিদেশে নেওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে ওনার ক্লিনিক্যাল প্যারামিটার বা শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভরশীল। মেডিকেল বোর্ডের সর্বসম্মত মতামত হলো, এখনই ওনাকে বিদেশে শিফট করা সম্ভব নয়। ১২-১৪ ঘণ্টা জার্নি করার সক্ষমতা তার শরীর এখনও অর্জন করেনি।”
এর আগে কাতার থেকে একটি বিশেষায়িত ‘এয়ার অ্যাম্বুলেন্স’ আসার কথা থাকলেও রোগীর শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে সেই পরিকল্পনা স্থগিত করা হয়েছে। চিকিৎসকরা স্পষ্ট করেছেন, স্বাস্থ্যের উল্লেখযোগ্য উন্নতি এবং ‘ফিট টু ফ্লাই’ সার্টিফিকেট না পাওয়া পর্যন্ত তাকে দেশেই চিকিৎসা দেওয়া হবে।
গুজব প্রতিরোধে সতর্কবার্তা
সোশ্যাল মিডিয়ায় বেগম জিয়ার স্বাস্থ্য নিয়ে ছড়িয়ে পড়া নানামুখী ‘ডিজইনফরমেশন’ বা গুজব সম্পর্কেও কথা বলেন ডা. জাহিদ। তিনি সাধারণ মানুষ ও দলীয় নেতাকর্মীদের বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক ভিত্তিহীন তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। দয়া করে কোনো গুজবে কান দেবেন না। মেডিকেল বোর্ডের অফিশিয়াল ব্রিফিং ছাড়া অন্য কোনো তথ্যে বিশ্বাস স্থাপন করবেন না।”