সেভিয়ার এস্তাদিও দে লা কারতুজায় শনিবারের সন্ধ্যাটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই এক ‘গোল ফেস্ট’। ম্যাচের ঘড়ির কাঁটা দশ মিনিট পার না হতেই বার্সেলোনার জালে বল। রিয়াল বেতিসের ডেরায় আবারও কোনো অঘটনের শঙ্কা যখন উঁকি দিচ্ছিল, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে আভির্ভূত হলেন ‘দ্য শার্ক’ খ্যাত ফেরান তরেস। স্প্যানিশ এই ফরোয়ার্ডের অনবদ্য হ্যাটট্রিক এবং আক্রমণভাগের সম্মিলিত জাদুতে শেষ পর্যন্ত ৫-৩ গোলের বড় জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে কাতালান জায়ান্টরা। এই জয়ে লা লিগার শিরোপা দৌড়ে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদের চেয়ে নিজেদের অবস্থান আরও সংহত করল বার্সা।
শুরুতে ধাক্কা ও তরেসের ত্বরিত জবাব
ম্যাচের শুরুটা বার্সেলোনার জন্য স্বস্তিদায়ক ছিল না। বল পজেশনে এগিয়ে থাকলেও কাউন্টার অ্যাটাক বা প্রতি আক্রমণে বার্সার রক্ষণভাগকে বারবার পরীক্ষায় ফেলছিল ম্যানুয়েল পেল্লেগ্রিনির শিষ্যরা। ম্যাচের মাত্র ষষ্ঠ মিনিটেই বার্সেলোনাকে স্তব্ধ করে দেন ব্রাজিলিয়ান উইঙ্গার অ্যান্টনি। চলতি মৌসুমে নিজের পঞ্চম গোলটি করে স্বাগতিক বেতিসকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন তিনি।
তবে এই লিড বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারেনি বেতিস। গোল হজমের পরই যেন বার্সেলোনার ‘অ্যাটাকিং মেশিন’ জেগে ওঠে। ১১ ও ১৩ মিনিট—মাত্র দুই মিনিটের ব্যবধানে জোড়া গোল করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের করে নেন ফেরান তরেস। এই দুই গোলের মাধ্যমে ম্যাচের মোমেন্টাম বা গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে যায়।
প্রথমার্ধেই বার্সার আধিপত্য ও রুনির ঝলক
ম্যাচের ৩১ মিনিটে বার্সেলোনার আক্রমণের ধার আরও বাড়ে। দারুণ ফর্মে থাকা তরুণ তুর্কি রুনি বারদাজি (Roony Bardghji) স্কোরশিটে নাম লেখান। মাঝমাঠের ‘মায়েস্ত্রো’ পেদ্রির নিখুঁত থ্রু বল ধরে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারকে বোকা বানিয়ে বক্সে ঢুকে পড়েন ২০ বছর বয়সী এই উইঙ্গার। এরপর জোরালো শটে লক্ষ্যভেদ করতে ভুল করেননি তিনি।
প্রথমার্ধের শেষদিকে, ৪০তম মিনিটে নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন তরেস। বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া তার শটটি প্রতিপক্ষের এক খেলোয়াড়ের গায়ে লেগে ‘ডিফ্লেকশন’ হয়ে দিক পরিবর্তন করে জালে জড়ায়। এটি তরেসের ক্যারিয়ারের তৃতীয় এবং বার্সেলোনার জার্সিতে দ্বিতীয় হ্যাটট্রিক। কাকতালীয়ভাবে, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে এই বেতিসের বিপক্ষেই তিনি বার্সার হয়ে প্রথম হ্যাটট্রিকটি করেছিলেন।
ভিএআর নাটক ও পেনাল্টি
প্রথমার্ধের ৪-১ গোলের লিড নিয়ে বিরতিতে যাওয়া বার্সা দ্বিতীয়ার্ধেও আক্রমণের ধার বজায় রাখে। ৫৯ মিনিটে ম্যাচে নাটকীয়তার সৃষ্টি হয় যখন রেফারি ভিএআর (VAR) চেক করে বার্সেলোনার পক্ষে পেনাল্টির বাঁশি বাজান। ডি-বক্সের ভেতরে মার্কাস রাশফোর্ডের নেওয়া শট বেতিস ডিফেন্ডার মার্ক বার্ত্রার পায়ে লেগে হাতে লাগলে রেফারি স্পট কিকের সিদ্ধান্ত দেন, যা নিয়ে বেতিস খেলোয়াড়দের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা যায়। স্পট কিক থেকে ঠাণ্ডা মাথায় গোল করে ব্যবধান ৫-১ করেন লামিনে ইয়ামাল।
ম্যাচের শেষদিকে কিছুটা রিলাক্সড মুডে চলে যায় বার্সেলোনা, আর সেই সুযোগে ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করে বেতিস। ৮৫ মিনিটে দিয়েগো ইয়োরেন্তে এবং নির্ধারিত সময়ের শেষ মিনিটে স্পট কিক থেকে চুচু হার্নান্দেজ গোল করলে হারের ব্যবধান ৫-৩ এ নামিয়ে আনে স্বাগতিকরা। তবে তা বার্সার জয় আটকানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না।
পরিসংখ্যান ও পয়েন্ট টেবিল
ম্যাচ শেষে পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বল পজেশনে বার্সেলোনা এগিয়ে থাকলেও শট নেওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে ছিল বেতিস। পেল্লেগ্রিনির দল ১৭টি শট নিয়ে ৫টি লক্ষ্যে রাখে, যেখানে হ্যান্সি ফ্লিকের শিষ্যরা ১৬টি শটের মধ্যে ৮টিই অন টার্গেটে রাখতে সক্ষম হয়। এই ‘ক্লিনিক্যাল ফিনিশিং’-ই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ব্যবধান গড়ে দেয়।
এই জয়ের ফলে ১৬ ম্যাচে ১৩ জয় ও ১ ড্রয়ে ৪০ পয়েন্ট নিয়ে লা লিগার পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষস্থান আরও মজবুত করল বার্সেলোনা। এক ম্যাচ কম খেলা রিয়াল মাদ্রিদের (৩৬ পয়েন্ট) চেয়ে তারা এখন ৪ পয়েন্টের ব্যবধানে এগিয়ে। অন্যদিকে, ১৫ ম্যাচে ২৪ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের পঞ্চম স্থানেই রইল রিয়াল বেতিস।