উন্নত জীবনের আশায় ইউরোপ পাড়ি দিতে গিয়ে আবারও ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশি রক্তিম হলো। স্বপ্নের ইউরোপ এখন অনেকের কাছেই মরণফাঁদ। শনিবার (৬ ডিসেম্বর) গ্রিসের দক্ষিণাঞ্চলীয় ক্রিট দ্বীপের অদূরে অভিবাসীবোঝাই একটি নৌকা ডুবে অন্তত ১৮ জনের করুণ মৃত্যু হয়েছে। গ্রিক কোস্টগার্ড ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
উত্তাল সাগরে উদ্ধার অভিযান ও বেঁচে ফেরার গল্প
শনিবারের এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি প্রথমে নজরে আসে একটি তুর্কি পণ্যবাহী জাহাজের। উত্তাল সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় দুজনকে জীবিত উদ্ধার করে জাহাজটি। মূলত তাদের মাধ্যমেই নৌকাডুবির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। জীবিত উদ্ধার হওয়া ওই দুজনকে তাৎক্ষণিকভাবে ক্রিট দ্বীপে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং জরুরি চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে।
খবর পাওয়ার পরপরই শুরু হয় ব্যাপক ‘রেসকিউ অপারেশন’ (Rescue Operation)। ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূল রক্ষী সংস্থা ‘ফ্রন্টেক্স’ (Frontex)-এর একটি জাহাজ এবং একটি বিমান দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় গ্রিক কোস্টগার্ডের একটি হেলিকপ্টার এবং ওই রুটে চলাচলকারী আরও তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজ। তবে ১৮টি মরদেহ উদ্ধার করা গেলেও, নৌকাটিতে মোট কতজন যাত্রী ছিলেন বা আরও কেউ নিখোঁজ আছেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
লিবিয়া-ক্রিট রুট: নতুন মৃত্যুফাঁদ?
২০১৫-১৬ সালের ভয়াবহ ‘মাইগ্রেন্ট ক্রাইসিস’ (Migrant Crisis) বা অভিবাসন সংকটের পর থেকেই গ্রিস ইউরোপে প্রবেশের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং এশিয়ার সংঘাত ও দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চল থেকে পালিয়ে আসা মানুষেরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই পথ বেছে নেন।
সাম্প্রতিক মাসগুলোর ডেটা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মানব পাচারকারীরা এখন রুট পরিবর্তন করছে। লিবিয়া থেকে সরাসরি গ্রিসের ক্রিট দ্বীপে পৌঁছানোর প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এটি আগের রুটগুলোর তুলনায় অনেক বেশি দীর্ঘ এবং বিপজ্জনক। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই রুটে প্রায়ই ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটছে, তবে শনিবারের ঘটনাটি সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম বড় বিপর্যয়।
শনাক্ত হয়নি উৎস, বাড়ছে উদ্বেগ
ডুবে যাওয়া নৌকাটি ঠিক কোথা থেকে যাত্রা শুরু করেছিল, তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি গ্রিক কর্তৃপক্ষ। তবে উদ্ধারকৃতদের জবানবন্দি এবং নৌকার গতিপথ বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, এটি উত্তর আফ্রিকার কোনো উপকূল, বিশেষত লিবিয়া বা মিশর থেকে ছেড়ে আসতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (European Union) সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করলেও অবৈধ পথে প্রবেশ বা ‘ইলিগ্যাল মাইগ্রেশন’ থামানো যাচ্ছে না। বরং যত দিন যাচ্ছে, পাচারকারীরা আরও দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিচ্ছে, যার ফলে ভূমধ্যসাগরে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল, ইউরোপের অভিবাসন নীতি এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় আরও মানবিক ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।