মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নাটকীয় পরিবর্তনের এক বছর পার করল সিরিয়া। সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ সরকারের পতন এবং হায়াত তাহরির আল-শামের (HTS) নেতা আহমেদ আল-শারা (যিনি মোহাম্মদ আল জোলানি নামেই অধিক পরিচিত)-এর ক্ষমতা গ্রহণের পর গত এক বছরে সিরিয়ার আকাশসীমা কার্যত ইসরাইলি বিমান বাহিনীর দখলে ছিল। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক যুদ্ধ পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা’ (ACLED)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র—বিগত ১২ মাসে সিরিয়ার ভূখণ্ডে অন্তত ৬০০ বার হামলা চালিয়েছে তেল আবিব।
বাশারের পতন ও ইসরাইলের ‘আগ্রাসন’ নীতি
গত বছরের ডিসেম্বরে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সম্মিলিত অভিযানে বাশার আল আসাদ সরকারের পতনের পর থেকেই দামেস্কের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তৈরি হয় এক ধরনের ‘পাওয়ার ভ্যাকুয়াম’ বা ক্ষমতার শূন্যতা। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ইসরাইল তাদের সামরিক তৎপরতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এসিএলইডি-র তথ্য মতে, গত বছরের ৮ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত—এই এক বছরে সিরিয়াজুড়ে ৬০০ বারেরও বেশি ‘এয়ার স্ট্রাইক’, ড্রোন (Drone) এবং আর্টিলারি (Artillery) হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF)। পরিসংখ্যান বলছে, গড়ে প্রতিদিন অন্তত দুটি করে হামলা চালানো হয়েছে সিরিয়ার মাটিতে, যা আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে বিরল।
হামলার পরিসংখ্যান ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তু
ইসরাইলের এই সামরিক অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল সিরিয়ার দক্ষিণানঞ্চল, যা ইসরাইল সীমান্তের কাছাকাছি। এসিএলইডি-র উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মোট আক্রমণের প্রায় ৮০ শতাংশই পরিচালিত হয়েছে কুনেইত্রা, দেরা এবং রাজধানী দামেস্ক এলাকায়। এর মধ্যে কুনেইত্রা প্রদেশ একাই ২৩২ বার এবং দেরা ১৬৭ বার ইসরাইলি আগ্রাসনের শিকার হয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, বাশার সরকারের পতনের পর সিরিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা ‘এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম’ (Air Defense System) দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সুযোগে ইসরাইল সিরিয়ার সামরিক অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়ার ‘ব্লু-প্রিন্ট’ বাস্তবায়ন করে। বাশারের পতনের মাত্র চার দিন পরেই ইসরাইল আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করে, তারা সিরিয়ার ৮০ শতাংশেরও বেশি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছে।
অজুহাত যখন ‘নিরাপত্তা ঝুঁকি’
দীর্ঘদিন ধরেই ইরানি সামরিক ঘাঁটি নির্মূলের যুক্তি দেখিয়ে সিরিয়ায় হামলা চালিয়ে আসছিল ইসরাইল। তবে বাশার আল আসাদের পতনের পর বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রশাসন তাদের নেরেটিভ বা বয়ানে পরিবর্তন আনে। তেল আবিবের দাবি, আসাদ বাহিনীর ফেলে যাওয়া অত্যাধুনিক অস্ত্র যাতে ‘এক্সট্রিমিস্ট’ বা চরমপন্থিদের (বিশেষ করে বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর) হাতে না যায়, তা নিশ্চিত করতেই এই ‘প্রিএম্পটিভ স্ট্রাইক’ বা আগাম হামলা চালানো হচ্ছে।
তবে বাস্তবতা হলো, এই অজুহাতে ইসরাইল সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে নিজেদের ‘স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ’ বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
বাফার জোন দখল ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন
হামলার পাশাপাশি স্থলপথেও আগ্রাসন চালিয়েছে ইসরাইল। ১৯৭৪ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে ইসরাইলি সেনারা গোলান মালভূমির সিরিয়া অংশে প্রবেশ করে এবং বেশ কয়েকটি নতুন সামরিক চৌকি স্থাপন করে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গোলান মালভূমি ছাড়াও জাতিসংঘের নির্ধারিত ‘বাফার জোন’ (Buffer Zone)-এর ২৩৫ বর্গকিলোমিটার এবং এর বাইরে সিরিয়ার আরও প্রায় ৪২০ বর্গকিলোমিটার এলাকা এখন ইসরাইলের দখলে।
জাতিসংঘ এবং আরব রাষ্ট্রগুলো এই দখলদারিত্বকে আন্তর্জাতিক আইন ও সিরিয়ার সার্বভৌমত্বের (Sovereignty) চরম লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যায়িত করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তবুও, ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন, ‘ইসরাইলি বাহিনী অনির্দিষ্টকালের জন্য এই এলাকায় অবস্থান করবে।’ এই ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাকে আরও উসকে দিয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।