বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম ধনী ক্লাব হিসেবে পরিচিতি থাকলেও বড়সড় আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে ইংলিশ জায়ান্ট ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। প্রথমবারের মতো ক্লাবটির ‘নেট ডেট’ বা ঋণের পরিমাণ ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলারের গণ্ডি ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১২ হাজার ২১৭ কোটি টাকার বেশি। ২০০৫ সালে গ্লেজার পরিবার ক্লাবের মালিকানা গ্রহণ করার পর ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের ইতিহাসে ঋণের এই অঙ্ক সর্বোচ্চ।
দলবদলের বাজারে খরচের ধাক্কা
বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) প্রকাশিত ক্লাবের প্রথম ত্রৈমাসিক ‘ফিনান্সিয়াল রিপোর্ট’-এ এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। মূলত গত ‘সামার ট্রান্সফার উইন্ডো’ বা গ্রীষ্মকালীন দলবদলে স্কোয়াড শক্তিশালী করতে গিয়ে অতিরিক্ত অর্থ ধার করার কারণেই ঋণের বোঝা এতটা ভারী হয়েছে।
রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, বেনজামিন সেসকো, ব্রায়ান এমবেউমো এবং ম্যাথিউস কুনহার মতো তারকাদের দলে ভেড়াতেই ক্লাবটিকে ১৫০ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি খরচ করতে হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সংস্থানের জন্য নতুন করে ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছে ক্লাব কর্তৃপক্ষ।
গ্লেজার জমানা ও ঋণের পরিসংখ্যান
গ্লেজার পরিবারের মালিকানাধীন সময়ে ক্লাবের ঘাড়ে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের বোঝা আগে থেকেই ছিল। বর্তমানে সেই দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৮১ মিলিয়ন পাউন্ড বা ৬৪৪ মিলিয়ন ডলারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্রীষ্মকালীন দলবদলের জন্য নেয়া ‘রিভলভিং ক্রেডিট’ বা ঘূর্ণায়মান ঋণ সুবিধা।
ক্লাবটি তাদের রিভলভিং ক্রেডিট লাইন থেকে ১০৫ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যবহার করায় মোট স্বল্পমেয়াদি ধারের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৬৮ মিলিয়ন পাউন্ডে। সব মিলিয়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মোট নেট ঋণের পরিমাণ এখন ৭৪৯ মিলিয়ন পাউন্ড, যা ডলারে কনভার্ট করলে দাঁড়ায় ১.০০২ বিলিয়ন ডলার।
র্যাটক্লিফের ‘কস্ট কাটিং’ ও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা
ঋণের অঙ্ক আকাশছোঁয়া হলেও এখনই হতাশ হতে রাজি নন ক্লাবের প্রধান নির্বাহী (CEO) ওমর বেরাদা। তিনি বিষয়টিকে ক্লাবের ‘ট্রান্সফর্মেশন’ বা রূপান্তর প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই দেখছেন। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ব্রিটিশ ধনকুবের স্যার জিম র্যাটক্লিফের নেতৃত্বাধীন আইনিওস (INEOS) গ্রুপ ১.৩ বিলিয়ন পাউন্ডে ক্লাবের ২৭.৭ শতাংশ শেয়ার কিনে নেয়। এরপর থেকেই ক্লাবের আর্থিক কাঠামো ও স্পোর্টিং প্রজেক্টে আমূল পরিবর্তনের ডাক দিয়েছে নতুন ম্যানেজমেন্ট।
ওমর বেরাদা বলেন, “গত এক বছরে নেয়া কঠিন সিদ্ধান্তগুলো আমাদের ব্যয়ের কাঠামোকে (Cost Structure) স্থায়ীভাবে কমিয়ে এনেছে। এটি ক্লাবকে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের দিকে এগিয়ে নিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। পুরুষ ও নারী—উভয় দলের প্রতিযোগিতামূলক শক্তি বৃদ্ধিতে আমরা এখন আরও পরিকল্পিতভাবে বিনিয়োগ করতে পারছি।”
রাজস্ব ও ব্যয়ের খতিয়ান
আইনিওস গ্রুপের পরিচালনায় ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে এখন চলছে ব্যাপক ‘কস্ট কাটিং’ বা ব্যয় সংকোচন নীতি। আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, কর্মী ছাঁটাই ও বেতন কাঠামো পুনর্গঠনের ফলে ক্লাবের কর্মী-সুবিধা সংক্রান্ত ব্যয় গত বছরের তুলনায় ৬.৬ মিলিয়ন পাউন্ড কমে ৭৩.৬ মিলিয়ন পাউন্ডে নেমে এসেছে। তবে আইনিওস পরিচালিত এই বিশাল পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার (Restructuring Program) অংশ হিসেবে প্রথম তিন মাসে ৮.৬ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয়ও হয়েছে।
অন্যদিকে, আয়ের দিক থেকে কিছুটা ধাক্কা খেয়েছে ক্লাবটি। ট্রেনিং কিটের স্পনসর না থাকায় ‘স্পনসরশিপ রেভিনিউ’ ৯.৩ শতাংশ কমে ৪৭ মিলিয়ন পাউন্ডে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া চলতি মৌসুমে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড উয়েফার অভিজাত প্রতিযোগিতায় অনুপস্থিত থাকায় মোট রাজস্ব ২ শতাংশ কমে ১৪০.৩ মিলিয়ন পাউন্ড হয়েছে।
তবুও ক্লাব কর্তৃপক্ষের আশা, মৌসুম শেষে তাদের মোট রাজস্ব ৬৪০ থেকে ৬৬০ মিলিয়ন পাউন্ডের ঘরে থাকবে, যা ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে।