দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দামামা বেজে গেছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের তারিখ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। এই উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা মিত্র দলগুলোর Seat Sharing বা আসন বন্টন নিয়ে চূড়ান্ত বোঝাপড়া হওয়ার কথা ছিল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে নাটকীয় মোড়। হেভিওয়েট নেতাদের ব্যস্ততা এবং কয়েকজনের অনুপস্থিতির কারণে পেছানো হয়েছে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটি।
বিএনপির গুলশান কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিক এই ‘হাইভোল্টেজ’ বৈঠকটি আগামী শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) বেলা ১১টায় অনুষ্ঠিত হবে। ভোটের আগে এই বৈঠকটিকেই শরিক দলগুলো তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব এবং কৌশলের জন্য ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে দেখছে।
বৈঠক পেছানোর নেপথ্য কারণ
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টায় বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এই বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, নজরুল ইসলাম খান এবং ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু যথাসময়ে উপস্থিতও ছিলেন। কিন্তু যুগপৎ আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি এবং গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর উপস্থিত হতে পারেননি।
রাত ৮টা পর্যন্ত অপেক্ষার পর, কোনো ধরনের Misunderstanding বা ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে বৈঠকটি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান সাংবাদিকদের বলেন, “বিএনপি নেতারা আমাদের জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেছেন। কিন্তু যেহেতু মূল কয়েকজনক নেতা উপস্থিত নেই, তাই তাড়াহুড়ো না করে শনিবার সকালে ঠান্ডা মাথায় বসে বিষয়গুলো চূড়ান্তভাবে নিষ্পন্ন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।”
আসন ভাগাভাগি: প্রত্যাশা ও বাস্তবতা
বিএনপির সঙ্গে প্রায় ৪০টি দল গত কয়েক বছর ধরে রাজপথে আন্দোলন করেছে। এখন নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে এসে দলগুলোর প্রধান এজেন্ডাই হলো ‘আসন সমঝোতা’। বিএনপি ইতিমধ্যেই তাদের প্রার্থিতা বা Nomination ঘোষণা করেছে, শরিকরাও পিছিয়ে নেই। এখন প্রশ্ন হলো, শরিকদের জন্য বিএনপি ঠিক কতটি আসন ছাড়বে?
রাশেদ খান এ বিষয়ে স্পষ্ট করে বলেন, “আমরা নিপীড়ন, রিমান্ড ও নির্যাতন সহ্য করে বিএনপির পাশে ছিলাম। এখন নির্বাচন সামনে রেখে প্রত্যেক দলেরই প্রত্যাশা থাকে। আমরা আশা করি, শনিবারের বৈঠকে একটি সঠিক ও ন্যায্য বা Fair Decision আসবে।” তিনি আরও যোগ করেন, আসন না পেলে জোট ভাঙবে কি না, তা এখনই বলার সময় আসেনি। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল শেখ হাসিনার পতন এবং ৩১ দফার ভিত্তিতে রাষ্ট্র সংস্কার। তবে শরিকরা যে সম্মানজনক হিস্যা চায়, তা তার কথায় স্পষ্ট।
নির্বাচনী তফসিল ও রাজনীতির সমীকরণ
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিলকে স্বাগত জানিয়েছে যুগপৎ আন্দোলনের শরিকরা। রাশেদ খান বলেন, “সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ওপর রাজনৈতিক দলগুলোর ধারাবাহিক Pressure-এর ফলেই দ্রুত তফসিল ঘোষিত হয়েছে। এর মাধ্যমে সকল অনিশ্চয়তা দূর হলো।” তিনি মনে করেন, নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কথিত চক্রান্ত নস্যাৎ হয়ে গেছে।
রাশেদ খান নিজেও ঝিনাইদহ-২ আসন থেকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং নিয়মিত এলাকায় জনসংযোগ করছেন।
দল বদল ও নতুন মেরুকরণ
রাজনীতির মাঠে গুঞ্জন ছিল রাশেদ খান বিএনপিতে যোগ দিচ্ছেন। এই গুঞ্জনকে ‘পুরোপুরি ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। তবে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদকে নিয়ে দিয়েছেন নতুন খবর। রাশেদ জানান, আসিফ মাহমুদের সঙ্গে তাদের Meeting হয়েছে এবং তিনি গণ অধিকার পরিষদে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেছেন। যদিও বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। আসিফ মাহমুদ বিএনপিতে যাবেন নাকি অন্য কোনো প্লাটফর্ম বেছে নেবেন, তা একান্তই তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শনিবারের বৈঠকটি তাই কেবল চা-চক্র নয়, বরং আগামী নির্বাচনের রাজনৈতিক মানচিত্র বা Political Landscape নির্ধারণে এক বড় ভূমিকা রাখতে যাচ্ছে। বিএনপি কতটুকু ছাড় দেয় এবং শরিকরা তাতে কতটা তুষ্ট হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।