ভারত সফরের চিত্রনাট্যটা যেন দু’টি ভিন্ন মেরুতে লেখা হলো। প্রথম অধ্যায় যদি হয় হতাশার, তবে দ্বিতীয় অধ্যায়টি নিশ্চিতভাবেই পূর্ণতার। কল্লোলিনী কলকাতায় যেখানে মাত্র ২২ মিনিটের উপস্থিতিতে নাভিশ্বাস উঠেছিল বিশ্বজয়ী তারকার, সেখানে মায়ানগরী মুম্বাই দেখল এক ভিন্ন মেসিকে। ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ৬১ মিনিটের জাদুকরী উপস্থিতিতে লিওনেল মেসি বুঝিয়ে দিলেন, সঠিক আয়োজন থাকলে তিনি ভক্তদের হতাশ করেন না। আর এই ঐতিহাসিক সন্ধ্যায় সাক্ষী থাকল এক বিরল মুহূর্ত—এক ফ্রেমে বন্দি হলেন ‘ক্রিকেট ঈশ্বর’ শচীন টেন্ডুলকার এবং ‘ফুটবল জাদুকর’ লিওনেল মেসি।
এক ফ্রেমে দুই ‘ঈশ্বর’ ও সুনীল ছেত্রীর প্রাপ্তি
মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম এদিন হয়ে উঠেছিল চাঁদের হাট। তবে সব আলো কেড়ে নিয়েছিল মেসি ও শচীনের সাক্ষাৎ। ভারতীয় ক্রিকেটের ‘লিভিং লিজেন্ড’ শচীন টেন্ডুলকার এবং বিশ্ব ফুটবলের মহাতারকা যখন করমর্দন করলেন, গ্যালারিতে তখন করতালির ঝড়। শুধু শচীন নন, ভারতীয় ফুটবলের সদ্য সাবেক হওয়া অধিনায়ক সুনীল ছেত্রীর সঙ্গেও অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ সময় কাটান মেসি।
সুনীলকে নিজের সই করা আর্জেন্টিনার আইকনিক জার্সি উপহার দেন মেসি, যা ভারতীয় ফুটবলের জন্য এক বড় প্রাপ্তি। এরপর দর্শকদের উন্মাদনা বাড়িয়ে মেসি, সুয়ারেজ ও ডি’পল পেনাল্টি শট নেন এবং নিখুঁত ফিনিশিংয়ে গোল করেন। মাঠের চারপাশ ঘুরে গ্যালারিতে বল কিক করে ভক্তদের ‘রিটার্ন গিফট’ দিতেও ভোলেননি এই ত্রয়ী।
ব্র্যাবোর্ন থেকে ওয়াংখেড়ে: তারকায় ঠাসা দিন
ওয়াংখেড়ের মূল ইভেন্টের আগে ‘ক্রিকেট ক্লাব অফ ইন্ডিয়া’ বা ব্র্যাবোর্ন স্টেডিয়ামে ‘প্যাডল কাপ’-এ অংশ নেন মেসি। সেখানে লুইস সুয়ারেজ ও রদ্রিগো ডি পলকে নিয়ে তিনি মেতে ওঠেন অন্যরকম এক ক্রীড়াশৈলীতে। গ্যালারিতে তখন উপস্থিত ছিলেন হরভজন সিং, কারিনা কাপুর খানের মতো তারকারা।
অন্যদিকে, দুপুর ২টো থেকেই ওয়াংখেড়ের গ্যালারি ভরতে শুরু করে। মেসি আসার অনেক আগেই দর্শকদের বিনোদনের জন্য আয়োজকরা ‘সেভেন-আ-সাইড’ প্রদর্শনী ম্যাচের আয়োজন করেন। সেখানে সুনীল ছেত্রী, আশুতোষ মেহতা, রাহুল ভেকেদের মতো পেশাদার ফুটবলারদের সঙ্গে মাঠে নামেন ডিনো মোরিয়া, জিম সরভ এবং বলিউড সুপারস্টার অজয় দেবগণ।
ভিন্ন এক ব্যবস্থাপনা: নিরাপত্তার চাদর ও দর্শকদের স্বস্তি
কলকাতার যুবভারতীতে দর্শকদের বিশৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক নেতাদের ভিড়ে মেসিকে যে অস্বস্তিতে পড়তে হয়েছিল, মুম্বাইয়ে তার লেশমাত্র ছিল না। বিকেল ৫টা ৪২ মিনিটে স্ত্রী অম্রুতাকে নিয়ে মাঠে প্রবেশ করেন মহারাষ্ট্রের তৎকালীন উপ-মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়ণবীস। তার কিছুক্ষণ পরেই আসেন শচীন। সন্ধ্যা ৬টা বাজার ১০ মিনিট আগে মাঠে প্রবেশ করেন মেসি ও তার সতীর্থরা।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল ‘Security Protocol’ বা নিরাপত্তা ব্যবলস্থাপনা। রাজনৈতিক নেতা, ফটোগ্রাফার বা সঞ্চালক—কেউই মেসির ব্যক্তিগত পরিসরে বা ‘Personal Space’-এ অনুপ্রবেশ করেননি। ফড়ণবীস বা শচীনের মতো ভিআইপিরাও বসেছিলেন দর্শকদের আসনে। ফলে গ্যালারির দর্শকরা কোনো বাধা ছাড়াই তাদের প্রিয় তারকাকে প্রাণভরে দেখার সুযোগ পান। কলকাতার দর্শকদের যে ক্ষোভ ভাঙচুরে রূপ নিয়েছিল, মুম্বাইয়ের দর্শকরা সেখানে বাড়ি ফিরেছেন একরাশ সুখস্মৃতি নিয়ে।
‘প্রজেক্ট মহাদেব’ ও ভবিষ্যতের স্বপ্নবুনন
তহবিলের জৌলুসের মাঝেও হারিয়ে যায়নি সামাজিক দায়বদ্ধতা। মহারাষ্ট্র সরকারের উদ্যোগে শুরু হওয়া ‘প্রজেক্ট মহাদেব’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন লিওনেল মেসি। এই প্রকল্পের আওতায় রাজ্যের ৩৫টি জেলা থেকে নির্বাচিত ৩০ জন প্রতিভাবান কিশোর-কিশোরীকে বাছা হয়েছে, যাদের আগামী পাঁচ বছর ফুটবলের বিশেষ ‘Scholarship’ বা বৃত্তি প্রদান করা হবে। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে বাচ্চাদের সঙ্গে ‘পাসিং দ্য বল’ খেলে তাদের উৎসাহিত করেন মেসি, সুয়ারেজ এবং ডি’পল। তৃণমূল স্তরে বা ‘Grassroots Level’-এ ফুটবলের প্রসারে এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে এক বড় পদক্ষেপ।
দিনশেষে, মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে প্রমাণ করে দিল, সঠিক পরিকল্পনা এবং পেশাদারিত্ব থাকলে মহাতারকাদের সম্মান জানানো এবং দর্শকদের প্রত্যাশা পূরণ—উভয়ই সম্ভব। মেসি ফিরলেন হাসিমুখে, আর ভারত পেল এক স্মরণীয় সন্ধ্যা।