অ্যানফিল্ডের গ্যালারিতে যখনই মোহামেদ সালাহ বল স্পর্শ করেন, দর্শকদের গর্জনে প্রকম্পিত হয় স্টেডিয়াম। শনিবার ব্রাইটনের বিপক্ষে ম্যাচেও তার ব্যতিক্রম হলো না। ইনজুরি আক্রান্ত জো গোমেজের বদলি হিসেবে ২৬ মিনিটে মাঠে নেমে আবারও নিজের জাত চেনালেন ‘ইজিপশিয়ান কিং’। তবে ২-০ গোলের জয়ের রাতে সালাহর দুর্দান্ত ‘Assist’ ও হুগো একিতিকের গোল ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠল একটি প্রশ্ন—এটাই কি অলরেড জার্সিতে সালাহর শেষ অধ্যায়? আফ্রিকান নেশনস কাপে (AFCON) যোগ দিতে যাওয়ার আগে লিভারপুল অধিনায়ক ভার্জিল ফন ডাইকের কণ্ঠেও শোনা গেল সেই অনিশ্চয়তার সুর, যদিও সতীর্থকে ধরে রাখতে নিজের আকুতি গোপন করেননি তিনি।
নাটকীয় সপ্তাহ ও সালাহর ‘ইমপ্যাক্ট’
লিভারপুলের গত সপ্তাহটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই ঘটনাবহুল। লিডসের বিপক্ষে ৩-৩ ড্রয়ের পর এক বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারে নিজেকে ‘Thrown under the bus’ বা বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে বলে দাবি করেছিলেন সালাহ। এই মন্তব্যের জেরে লিভারপুল বস আর্নে স্লট তাকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ইন্টার মিলানের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের ‘Squad’ থেকে বাদ দেন।
তবে শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর) স্লট ও সালাহর মধ্যে ‘Peace Talk’ বা সমঝোতা বৈঠক হয় এবং বরফ গলে। ব্রাইটনের বিপক্ষে ম্যাচে ফিরেই সালাহ প্রমাণ করেন, কেন তিনি অপরিহার্য। তার নেওয়া নিখুঁত কর্নার থেকেই দলের দ্বিতীয় গোলটি করেন একিতিকে। মাঠের পারফরম্যান্সে সালাহ বুঝিয়ে দিয়েছেন, ক্লাবের প্রতি তার নিবেদন বা ‘Commitment’-এ কোনো ঘাটতি নেই।
ফন ডাইকের চাওয়া ও রূঢ় বাস্তবতা
ম্যাচ শেষে লিভারপুলের ‘ডিফেন্সিভ ওয়াল’ ও অধিনায়ক ভার্জিল ফন ডাইক কথা বলেন সালাহর ভবিষ্যৎ নিয়ে। সতীর্থের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানালেও ফুটবলাঙ্গনের অনিশ্চয়তার বিষয়টি তিনি উড়িয়ে দেননি।
ফন ডাইক বলেন, ‘‘প্রথমত, এটা আমার ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি পুরো দলের বিষয়। আমি মো’র (সালাহ) সঙ্গে কথা বলি, ঠিক যেমন সবার সঙ্গেই বলি। ড্রেসিংরুমে তার উপস্থিতি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সে আমার দলের অন্যতম ‘Leader’ বা নেতা। ব্রাইটনের বিপক্ষে আরেকটি অ্যাসিস্ট দিয়ে সে নিজের গুরুত্ব আবারও প্রমাণ করেছে।’’
তবে সালাহর থাকা না থাকা নিয়ে ফন ডাইক যোগ করেন, ‘‘আমি চাই সে থাকুক। কিন্তু ফুটবলে কী হবে, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। মো এখন আফ্রিকান নেশনস কাপে যাচ্ছে। আমরা আশা করি ও সেখানে সফল হবে এবং অবশ্যই ফিরে আসবে। মৌসুমের বাকি অংশের জন্য তাকে আমাদের ভীষণ প্রয়োজন। তবে এই পরিস্থিতিতে ম্যানেজমেন্ট, প্লেয়ারসহ আরও অনেক পক্ষ জড়িত।’’
আফকন বিরতি ও ভবিষ্যতের জল্পনা
মিশরের হয়ে আফকনে অংশ নিতে সালাহ এখন ইংল্যান্ড ছাড়বেন। আগামী এক মাসেরও বেশি সময় তিনি ক্লাবের বাইরে থাকবেন। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এই দীর্ঘ বিরতি বা ‘International Break’ সালাহর দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। অ্যানফিল্ডের অন্দরমহলে গুঞ্জন, এই সময়েই হয়তো সালাহ তার ক্যারিয়ারের পরবর্তী গন্তব্য নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।
ড্রেসিংরুমের ঐক্য ও শিরোপা দৌড়
সালাহ ও কোচের মধ্যকার সাম্প্রতিক টানাপোড়েন দলের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলবে কি না—এমন শঙ্কায় ছিল ভক্তরা। তবে ফন ডাইক আশ্বস্ত করেছেন যে, দলের ভেতরের পরিবেশ বা ‘Team Spirit’ অটুট রয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘পর্দার আড়ালে অনেক কিছুই সামলাতে হয়, কিন্তু দিনশেষে পারফরম্যান্সই আসল কথা। আমরা ঐক্যবদ্ধ এবং সাদা লাইনের ভেতরে ৯৫ মিনিট আমরা একে অপরের জন্য লড়তে প্রস্তুত। মৌসুমটা লম্বা, আমাদের এখন শান্ত থেকে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে।’’
সালাহবিহীন আগামী এক মাস লিভারপুলের জন্য নিশ্চিতভাবেই বড় পরীক্ষা। এখন দেখার বিষয়, আফকন থেকে ফিরে সালাহ কি আবারও অ্যানফিল্ড মাতাবেন, নাকি এই অ্যাসিস্টটিই হয়ে থাকবে অলরেড জার্সিতে তার শেষ জাদুকরী মুহূর্ত।