সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘Viral’ হওয়ার নেশা যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার এক করুণ ও মর্মান্তিক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো শেরপুরের সীমান্তে। ফেসবুকে আপলোডের জন্য বন্যহাতির ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে হাতির পায়ে পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ওমর ফারুক (৪০) নামের এক ব্যক্তি। সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) বিকেলে শ্রীবরদী উপজেলার বালিজুরী রেঞ্জের মালাকোচা বিটের সোনাঝুড়ি এলাকায় এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে।
নিহত ওমর ফারুক পেশায় একজন ক্ষুদ্র চা ব্যবসায়ী হলেও স্থানীয়ভাবে তিনি শৌখিন ‘Content Creator’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার বাড়ি পার্শ্ববর্তী ঝিনাইগাতী উপজেলার ফকরাবাদ গ্রামে, বাবার নাম সুরুজ আলী।
ঝুঁকি নিয়ে ভিডিও ধারণ ও করুণ পরিণতি
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সোমবার বিকেলে ভারতীয় সীমান্ত সংলগ্ন সোনাঝুড়ি এলাকায় ৩০ থেকে ৩৫টি বন্যহাতির একটি দল লোকালয়ে নেমে আসে। বন্যহাতির এই বিশাল বহর দেখতে স্থানীয় উৎসুক জনতা ভিড় জমায়। খবর পেয়ে ওমর ফারুকও ঘটনাস্থলে ছুটে যান। উদ্দেশ্য ছিল, হাতির পালের ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকে আপলোড করা, যা তার ‘Social Media Engagement’ বাড়াতে সাহায্য করবে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভিডিওটি আকর্ষণীয় করতে ওমর ফারুক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাতির অত্যন্ত কাছাকাছি বা ‘Close Range’-এ চলে যান। এসময় দলের একটি ক্ষুব্ধ বন্যহাতি তাকে ধাওয়া করে। পালানোর সুযোগ পাওয়ার আগেই হাতিটি তাকে শুঁড় দিয়ে পেঁচিয়ে ধরে এবং নির্মমভাবে পায়ে পিষ্ট করে। চোখের পলকে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে যায় উপস্থিত জনতা।
উদ্ধার তৎপরতা ও মৃত্যু
হাতির আক্রমণের পর স্থানীয় বাসিন্দারা সাহসিকতার পরিচয় দেন। তারা দলবদ্ধ হয়ে হৈ-হুল্লোড়, লাঠি-সোঁটা এবং মশাল জ্বালিয়ে হাতির দলটিকে তাড়ানোর চেষ্টা করেন। হাতির পাল সরে গেলে গুরুতর আহত ও রক্তাক্ত অবস্থায় ওমর ফারুককে ‘Rescue’ করে দ্রুত শ্রীবরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে হাসপাতালের ‘Emergency Unit’-এ কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
বন বিভাগের সতর্কতা ও আইনি বার্তা
এই মর্মান্তিক ঘটনার পর বালিজুরী রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সুমন মিয়া গভীর শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “হাতি চলাচলের সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের সীমান্ত সড়ক দিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চলাচলের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেকেই তা মানছেন না। বিশেষ করে ‘Content Creator’-রা ভিডিও ধারণের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে প্রবেশ করছেন।”
তিনি আরও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন বা ‘Wildlife Protection Act’ অনুযায়ী, সংরক্ষিত বনে ঢুকে বন্যপ্রাণীকে বিরক্ত করা বা উত্যক্ত করা দণ্ডনীয় অপরাধ। আমরা বারবার অনুরোধ করছি, কেউ যেন ভিডিওর জন্য অতি উৎসাহী হয়ে বনের ভেতর প্রবেশ না করেন। ভবিষ্যতে কেউ হাতিকে বিরক্ত করলে বন বিভাগের পক্ষ থেকে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
ওমর ফারুকের এই মৃত্যু আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, ভার্চুয়াল দুনিয়ার আকর্ষণের চেয়ে বাস্তব জীবনের মূল্য অনেক বেশি। সামান্য একটি ভিডিওর জন্য এমন অকাল মৃত্যু এলাকায় শোকের ছায়া নামিয়ে এনেছে।