• আন্তর্জাতিক
  • ফুকুশিমার ক্ষত মুছে ১৫ বছর পর ফের চালু হচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, জাপানে চূড়ান্ত ক্ষণগণনা

ফুকুশিমার ক্ষত মুছে ১৫ বছর পর ফের চালু হচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, জাপানে চূড়ান্ত ক্ষণগণনা

আন্তর্জাতিক ১ মিনিট পড়া
ফুকুশিমার ক্ষত মুছে ১৫ বছর পর ফের চালু হচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, জাপানে চূড়ান্ত ক্ষণগণনা

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে চায় টোকিও; নিগাতায় আজ ঐতিহাসিক ভোট।

১৫ বছর আগে ফুকুশিমা দাইচি পারমাণবিক বিপর্যয় কাঁপিয়ে দিয়েছিল পুরো বিশ্বকে। সেই ভয়াবহ স্মৃতি আর নিরাপত্তার শঙ্কা কাটিয়ে দীর্ঘ দেড় দশক পর বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ‘কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া’ (Kashiwazaki-Kariwa) পুনরায় চালু করার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে জাপান। দেশটির রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ পরিষেবা সংস্থা টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি (TEPCO) এই বিশাল কর্মযজ্ঞের নেতৃত্বে রয়েছে।

নিগাতায় ঐতিহাসিক ভোট ও পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া

জাপানের রাজধানী টোকিও থেকে প্রায় ২২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত নিগাতা প্রিফেকচারে আজ সোমবার (২২ ডিসেম্বর) এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভোট হওয়ার কথা রয়েছে। এই ভোটের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুনরায় চালুর আইনি ও স্থানীয় অনুমোদন। যদি আজ প্রত্যাশিত অনুমোদন পাওয়া যায়, তবে ২০২৬ সালের ২০ জানুয়ারি এই কেন্দ্রের সাতটি শক্তিশালী চুল্লির (Reactor) মধ্যে প্রথমটি সক্রিয় করার পরিকল্পনা করছে টেপকো।

ফুকুশিমার ট্র্যাজেডি ও দীর্ঘ বিরতি

২০১১ সালের মার্চ মাসে ৯.০ মাত্রার বিধ্বংসী ভূমিকম্প এবং তার পরবর্তী প্রলয়ঙ্করী সুনামির আঘাতে জাপানের ফুকুশিমা দাইচি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় তখন জাপানের মোট ৫৪টি পারমাণবিক চুল্লি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া কেন্দ্রটিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এরপর থেকে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে এই কেন্দ্রটি অলস পড়ে ছিল। জাপানি জনগণের মনে পারমাণবিক শক্তি নিয়ে তৈরি হয়েছিল এক গভীর অবিশ্বাস।

জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাপান তার ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির (Fossil Fuel) ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তবে বিশ্ব রাজনীতির অস্থিরতা এবং জ্বালানির চড়া দাম বিবেচনায় নিয়ে জাপান সরকার আবারও পারমাণবিক শক্তির দিকে ঝুঁকছে। বর্তমানে জাপানের ৩৩টি সচল চুল্লির মধ্যে ১৪টি ইতোমধ্যে পুনরায় চালু করা হয়েছে। কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া হবে টেপকো পরিচালিত প্রথম কেন্দ্র যা দীর্ঘ বিরতির পর উৎপাদনে ফিরছে। উল্লেখ্য, এই কোম্পানিটিই বিতর্কিত ফুকুশিমা কেন্দ্রটি পরিচালনা করত।

কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া: এক নজরে বিশ্বের বৃহত্তম শক্তিকেন্দ্র

বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই স্থাপনার আয়তন প্রায় ৪২ লাখ বর্গমিটার বা ৪২০ হেক্টর। এতে মোট ৭টি পারমাণবিক চুল্লি রয়েছে, যা পূর্ণ ক্ষমতায় চললে জাপানের বিশাল অংশের বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে সক্ষম। টেপকো দাবি করছে, দীর্ঘ সময় ধরে এই কেন্দ্রটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করা হয়েছে যাতে ২০১১ সালের মতো কোনো বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

প্রতিবাদ ও জননিরাপত্তার প্রশ্ন

তবে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুনরায় চালুর এই সিদ্ধান্তে বিভক্ত জাপানের জনমত। আজ নিগাতা প্রিফেকচারের সামনে প্রায় ৩০০ জন বিক্ষোভকারী জড়ো হয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানান। যাদের অধিকাংশই প্রবীণ নাগরিক। তাদের হাতের ব্যানারে লেখা ছিল—‘পারমাণবিক শক্তি বন্ধ করো’ এবং ‘ফুকুশিমার আর্তনাদ মনে রাখো’। বিক্ষোভকারীদের প্রশ্ন, যে টেপকো ফুকুশিমা বিপর্যয় ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছিল, তারা কি এই বিশাল কেন্দ্র পরিচালনার যোগ্য?

টেপকোর অবস্থান ও নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি

টেপকোর মুখপাত্র মাসাকাতসু তাকাতা বলেন, "আমরা দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে আগের মতো কোনো দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না। নিগাতার বাসিন্দাদের নিরাপত্তা আমাদের কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। আমরা বাসিন্দাদের আস্থা অর্জনে কাজ করে যাচ্ছি।" তবে ঠিক কবে নাগাদ বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো তারিখ উল্লেখ করতে অস্বীকৃতি জানান।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জাপানের এই পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক শক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেবে। আমদানিকৃত জ্বালানি নির্ভরতা কমিয়ে এনার্জি সিকিউরিটি (Energy Security) নিশ্চিত করা এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানি নীতিতে ফিরে আসাই এখন টোকিও’র মূল লক্ষ্য।

Tags: japan nuclear world largest tepco restart kashiwazaki kariwa energy security fukushima legacy green energy nuclear reactor