অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় দলের ব্যাটিং স্তম্ভ উসমান খাজা কেবল একজন সফল ক্রিকেটারই নন, সিডনির রাজপথে বেড়ে ওঠা এক লড়াকু ব্যক্তিত্ব। তবে সম্প্রতি তার সেই লড়াইয়ের ময়দান মাঠের ২২ গজ থেকে বদলে গেছে সাইবার জগতের কুৎসিত অলিগলিতে। অস্ট্রেলিয়ার এই জনপ্রিয় মুসলিম ক্রিকেটারের পরিচয়কে কেন্দ্র করে তার পরিবার এখন ভয়াবহ ‘অনলাইন ট্রোলিং’ এবং ‘হেইট ক্রাইম’-এর শিকার। বিশেষ করে খাজার দুই নাবালিকা কন্যাকেও এই ঘৃণ্য আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করায় স্তম্ভিত ক্রীড়াঙ্গন।
বন্ডি বিচ ট্র্যাজেডি ও পরবর্তী উগ্রবাদ
সম্প্রতি সিডনির বন্ডি বিচে (Bondi Beach) সংঘটিত একটি মর্মান্তিক হামলার ঘটনার পর থেকেই পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। ডেইলি মেইলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই ঘটনার পর থেকেই খাজার পরিবারকে টার্গেট করে কট্টরপন্থীরা অনলাইনে বিষোদগার শুরু করে। খাজার স্ত্রী রাচেল খাজা গত কয়েক দিনে তাদের ওপর আসা অকল্পনীয় ঘৃণার চিত্র তুলে ধরেছেন। রাচেল জানান, তারা আগেও মাঝেমধ্যে বিরূপ মন্তব্যের শিকার হতেন, কিন্তু বন্ডি বিচের ঘটনার পর এই ‘ইসলামোফোবিয়া’ (Islamophobia) বা ইসলামবিদ্বেষ চরমে পৌঁছেছে।
শিশুদের লক্ষ্য করে অশালীন আক্রমণ
রাচেল খাজা তার ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেলে কিছু মন্তব্যের স্ক্রিনশট (Screenshot) শেয়ার করেছেন, যা দেখে শিউরে উঠছেন নেটিজেনরা। সেখানে খাজার দুই ছোট্ট মেয়ের ছবি ও ভিডিওর নিচে অত্যন্ত অশালীন, কুরুচিপূর্ণ এবং বর্ণবাদী মন্তব্য করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে খাজার পরিবারকে উদ্দেশ্য করে ‘পাকিস্তানে ফিরে যাও’—এর মতো পুরনো বর্ণবাদী গালিও ব্যবহার করা হয়েছে। শিশুদের ওপর এমন সাইবার বুলিং (Cyber Bullying) অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশের সামাজিক শিষ্টাচার নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
খাজার পরিচয় ও বর্ণবাদবিরোধী অবস্থান
উসমান খাজা জন্মসূত্রে পাকিস্তানের ইসলামাবাদের হলেও মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান। সিডনিতেই তার বেড়ে ওঠা এবং অস্ট্রেলীয় সংস্কৃতিতে মিশে যাওয়া। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে খাজা সবসময়ই ‘রেসিজম’ (Racism) বা বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। ক্রিকেটের মাঠে ‘ইনক্লুসিভিটি’ (Inclusivity) বা সর্বজনীন অন্তর্ভুক্তির পক্ষে তিনি এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। বন্ডি বিচের হামলার পর খাজা নিজেই শোক প্রকাশ করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু উগ্রপন্থীদের লক্ষ্যবস্তু হওয়া থেকে রেহাই পাননি তিনি।
রাচেল খাজার সাহসী প্রতিবাদ ও সংহতির আহ্বান
চুপ না থেকে এই ঘৃণার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাক দিয়েছেন রাচেল খাজা। তিনি তার পোস্টে লিখেছেন, "এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি আমাদের সংহতি প্রয়োজন। ইহুদিবিদ্বেষ (Antisemitism), ইসলামোফোবিয়া এবং বর্ণবাদের বিরুদ্ধে আমাদের একত্রে রুখে দাঁড়াতে হবে।" তিনি মনে করেন, একটি বিশেষ গোষ্ঠীর অপরাধের দায়ভার পুরো সম্প্রদায়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এবং নিরপরাধ শিশুদের আক্রমণ করা কোনো সুস্থ সমাজের কাজ হতে পারে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উসমান খাজার মতো একজন জাতীয় বীরের পরিবারের সাথে এমন আচরণ বিশ্বজুড়ে ‘ডিজিটাল ডিসকোর্স’ (Digital Discourse) এবং সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই প্রকট করে তুলেছে। খাজার পাশে দাঁড়িয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার অসংখ্য সাধারণ নাগরিক ও ক্রিকেট ভক্তরা, যারা এই ঘৃণা ছড়ানো চক্রের দ্রুত শাস্তি দাবি করছেন।