বরিশাল অঞ্চলে অটোরিকশা ছিনতাইকারী ও চোরচক্রের তাণ্ডব এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। সামান্য একটি ব্যাটারিচালিত রিকশার নেশায় গত দুই বছরে এই জনপদে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৫ জন চালক। স্রেফ চুরির উদ্দেশ্যে সংঘটিত এসব অপরাধের পর মরদেহ গুম করার মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটছে নিয়মিত। অভিযোগ উঠেছে, এই ‘Criminal Syndicate’-এর সদস্যরা পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও আইনি ফাঁকফোকরে জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় একই লোহমর্ষক অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে।
খুনের ভয়ংকর ‘মোডাস অপারেন্ডি’ (Modus Operandi)
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই চক্রটির কাজ করার ধরন অত্যন্ত পরিকল্পিত। সাধারণত তারা যাত্রীবেশে নির্জন বা দূরবর্তী গন্তব্যে যাওয়ার জন্য চড়া ভাড়ার প্রলোভন দেখিয়ে অটোরিকশা ভাড়া করে। এরপর মাঝপথে চালকের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলে তাকে কৌশলে ঘুমের ওষুধ মিশ্রিত ‘Energy Drink’ বা পানীয় পান করানো হয়। চালক অচেতন হয়ে পড়লে নির্জন স্থানে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা বা নদীতে ফেলে দিয়ে রিকশাটি নিয়ে চম্পট দেয় তারা। অনেক ক্ষেত্রে চালক বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করতেও দ্বিধা করে না এই ‘Serial Killers’ চক্র।
সোহেল ও হিরনের বিষাদময় পরিণতি
এই নৃশংসতার শিকার নগরীর দক্ষিণ আলেকান্দার সোহেল ফরাজী। গত বছরের মে মাসে রিকশা নিয়ে বের হয়ে নিখোঁজ হন তিনি। প্রায় দুই মাস পর খয়রাবাদ সেতুর নিচে তার কঙ্কালসার দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়। ঘাতক ইমরান পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি দেয় যে, তারা চারজন মিলে এনার্জি ড্রিংকসে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে সোহেলকে অচেতন করে নদীতে ফেলে দিয়েছিল। মর্মান্তিক বিষয় হলো, মামলার প্রধান আসামি ইমরান বর্তমানে ‘Bail’ বা জামিনে মুক্ত রয়েছেন।
একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে অটোরিকশা চালক হিরন হাওলাদারের ক্ষেত্রে। নিখোঁজের ২৯ দিন পর সাপানিয়া গ্রামের একটি নালা থেকে তার গলিত মরদেহ উদ্ধার করে র্যাব-৮। নিহতের পরিবারগুলো এখন বিচারহীনতার ভয়ে এবং চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে।
চোরাই রিকশার ‘কালো বাজার’ ও গোপন সাম্রাজ্য
অটোরিকশা চুরির পর এগুলো সহজে শনাক্ত করা যায় না, কারণ এগুলোর কোনো ‘Legal Registration’ বা বৈধ কাগজপত্র থাকে না। তদন্তে দেখা গেছে, ঝালকাঠির কলেজ মোড়, বরিশালের পলাশপুর এবং মোহাম্মদপুর এলাকায় এই চোরাই মালের শক্তিশালী ‘Black Market’ গড়ে উঠেছে। সেখানে চোরাই অটো নামমাত্র মূল্যে কেনা হয় এবং দ্রুততম সময়ে সেগুলোকে খণ্ড খণ্ড করে ‘Spare Parts’ হিসেবে আলাদা করে বিক্রি করে দেওয়া হয়। ফলে অপরাধের আলামতও মুছে যায় দ্রুত।
প্রশাসনের সীমাবদ্ধতা ও আইনি জটিলতা
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রেজাউল বারী জানিয়েছেন, নগরীতে অবৈধ অটোরিকশার সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বৈধ ডাটাবেজ না থাকায় চুরির পর রিকশাগুলো শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। তবে অবৈধ যান নিয়ন্ত্রণে শীঘ্রই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে, বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, “পুলিশ অপরাধ দমনে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটলেও অপরাধীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে।” তবে স্থানীয়দের দাবি, শুধুমাত্র ধরপাকড় নয়, এই সিন্ডিকেট নির্মূলে দীর্ঘমেয়াদী এবং কঠোর ‘Law Enforcement’ কার্যক্রম প্রয়োজন।
বরিশালের রাজপথে এখন অটোরিকশা চালকদের চোখেমুখে অজানা আতঙ্ক। প্রতিটি ট্রিপ যেন তাদের কাছে জীবনের শেষ যাত্রা না হয়, সেই শঙ্কায় কাটছে তাদের প্রতিদিনের জীবিকা সংস্থান।