• জাতীয়
  • ২৪ হাজার কোটি টাকায় তৃতীয় গ্যাস পাইপলাইন: এলএনজি আমদানির সক্ষমতা বাড়াতে সরকারের বড় উদ্যোগ

২৪ হাজার কোটি টাকায় তৃতীয় গ্যাস পাইপলাইন: এলএনজি আমদানির সক্ষমতা বাড়াতে সরকারের বড় উদ্যোগ

গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল) কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ২৪ হাজার ৩২০ কোটি টাকা। এর মাধ্যমে মহেশখালী ও মাতারবাড়ী অঞ্চল থেকে ২৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাবে।

জাতীয় ১ মিনিট পড়া
২৪ হাজার কোটি টাকায় তৃতীয় গ্যাস পাইপলাইন: এলএনজি আমদানির সক্ষমতা বাড়াতে সরকারের বড় উদ্যোগ

দেশের ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা এবং দেশীয় উৎপাদনের ঘাটতি মেটাতে সরকার আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রায় ২৪ হাজার ৩২০ কোটি টাকা ব্যয়ে 'মহেশখালী/মাতারবাড়ী-বাখরাবাদ তৃতীয় সমান্তরাল গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণ' শীর্ষক একটি মেগা প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই পাইপলাইন নির্মাণ হলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ২৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা তৈরি হবে, যা ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অত্যাবশ্যক।

গ্যাসের চাহিদা ও দেশীয় উৎপাদনের ব্যবধান

বাংলাদেশে গ্যাসের চাহিদা প্রতিদিন বেড়েই চলেছে, অথচ দেশীয় উৎপাদন ক্রমাগত কমছে। একসময় দেশীয় উৎস থেকে দৈনিক ২৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেলেও, বর্তমানে তা ১৭৪৮ মিলিয়ন ঘনফুটে (২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত) নেমে এসেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানার মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। আগে যেখানে বিবিয়ানা থেকে দৈনিক ১৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হতো, এখন তা নেমে এসেছে মাত্র ৮৫৫ ঘনফুটে। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, ২০২৬ সালের শেষে বিবিয়ানার উৎপাদন ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে যেতে পারে, যা দেশীয় উৎপাদনকে আরও নামিয়ে দেবে।

পাইপলাইন প্রকল্পের বিশদ বিবরণ

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার তৃতীয় গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। আন্তর্জাতিক পরামর্শক সংস্থার মাধ্যমে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। সমীক্ষা অনুযায়ী, মহেশখালী সিটিএমএস থেকে কুমিল্লার বাখরাবাদ পর্যন্ত ৪৬ ইঞ্চি ব্যাসের ৩২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন নির্মাণ করা হবে। এছাড়াও, মাতারবাড়ী থেকে উত্তর নলবিলা ভাল্ব স্টেশন পর্যন্ত ৪০ ইঞ্চি ব্যাসের আরও ৯ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপন করা হবে। প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ২৪ হাজার ৩২০ কোটি টাকা। এটি ২০২৬ সালের জুলাইয়ে শুরু হয়ে ২০৩১ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা।

এলএনজি আমদানির অবকাঠামো ও সক্ষমতা

বর্তমানে মহেশখালীতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) থেকে দৈনিক ১১০০ মিলিয়ন ঘনফুট আরএলএনজি সরবরাহ করা হয়। তবে পাইপলাইনের সীমাবদ্ধতার কারণে এখন সর্বোচ্চ ১৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস আমদানি করা সম্ভব। নতুন এই পাইপলাইনটি নির্মিত হলে ভবিষ্যতে যুক্ত হতে যাওয়া আরও ১৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এর মধ্যে কুতুবজোমে একটি নতুন ভাসমান টার্মিনাল থেকে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক টার্মিনাল থেকে ১০০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হবে। সব মিলিয়ে মহেশখালী ও মাতারবাড়ী অঞ্চল থেকে মোট ২৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পরিবহনের সক্ষমতা তৈরি হবে।

অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক আগ্রহ

যদিও প্রকল্পটি জিটিসিএলের, কিন্তু নিজস্ব অর্থায়নে এটি বাস্তবায়নের সক্ষমতা প্রতিষ্ঠানটির নেই। তাই বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা, আইডিএসহ আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এদিকে, মাতারবাড়ী ও মহেশখালীতে নতুন টার্মিনাল স্থাপনের জন্য সৌদি আরব, কাতার, আজারবাইজানসহ চারটি দেশ আগ্রহ দেখিয়েছে। সময় বাঁচাতে সরকার উন্মুক্ত দরপত্রের পরিবর্তে 'জিটুজি' (সরকারের সাথে সরকারের) ভিত্তিতে দ্রুত এই প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা ভাবছে।

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান জানিয়েছেন, প্রতি বছর দেশীয় গ্যাস উৎপাদন গড়ে ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট করে কমছে। এই ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানি করা ছাড়া আপাতত কোনো বিকল্প নেই, যদিও এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে আমদানির অবকাঠামোও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, ২৪ হাজার কোটি টাকার এই পাইপলাইন প্রকল্পটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

Tags: petrobangla energy security gas pipeline lng import gtcl bangladesh gas bibiyana gas field