বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে কলুষমুক্ত করতে হলে সবার আগে ‘টাকার খেলা’ বন্ধ করতে হবে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গনে অর্থের এই আস্ফালন সাধারণ মানুষের ভোটাধিকারকে হরণ করছে।
মঙ্গলবার (২৩ ডিসেম্বর) বিকেলে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র) ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ডেইলি স্টার’ আয়োজিত এক বিশেষ ‘ইলেকশন ডায়লগ’ (Election Dialogue) অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
লুটপাটের অর্থনীতি ও ফ্যাসিবাদের যোগসূত্র
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম তার বক্তব্যে বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের মূলে অর্থনৈতিক অসংগতিকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, “দেশে যদি ‘লুটপাটের অর্থনীতি’ (Looting Economy) কায়েম থাকে, তবে রাজনীতিও অনিবার্যভাবে লুটপাটের রাজনীতিতে পরিণত হবে। যদি আমরা ফ্যাসিবাদের (Fascism) উত্থান ঠেকাতে চাই, তবে সবার আগে এই লুটপাটের অর্থনৈতিক কাঠামো গুঁড়িয়ে দিতে হবে।” তার মতে, অর্থনৈতিক বৈষম্যই রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের পথ প্রশস্ত করে দেয়।
স্বাধীনতার মূল চেতনা ও সমাজতন্ত্রের প্রাসঙ্গিকতা
মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত লক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রবীণ এই রাজনৈতিক নেতা বলেন, “পুঁজিবাদী (Capitalist) বাংলাদেশের জন্য এ দেশ স্বাধীন হয়নি। আমাদের লক্ষ্য ছিল শোষণমুক্ত সমাজ। বর্তমানে দেশ সেই পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। এখন সময় এসেছে নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রের (Socialism) অভিমুখে নতুন লক্ষ্য স্থির করে যাত্রা শুরু করার।” তিনি মনে করেন, আদর্শিক পরিবর্তন ছাড়া প্রকৃত মুক্তি সম্ভব নয়।
ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও গণক্ষমতায়ন
শাসনব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করে সেলিম বলেন, রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে ‘ইনসাফ’ বা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, “আমাদের ইতিহাসের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে দেশ গড়তে হবে, তা না হলে বড় ধরনের ভুল হয়ে যাবে। শাসন কাঠামোর ভেতরে জনগণের প্রকৃত ক্ষমতায়ন (People's Empowerment) নিশ্চিত করতে হবে।”
তিনি আরও প্রস্তাব করেন যে, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ (Decentralization) না করলে উন্নয়নের সুফল তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছাবে না। উন্নয়নের পরিকল্পনা হতে হবে নীচ থেকে উপরে—অর্থাৎ গ্রাম ও ইউনিয়ন পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায়ে। গ্রাসরুট লেভেলে (Grassroots Level) সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা অসম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন।
একটি সামগ্রিক পরিবর্তনের ডাক
অনুষ্ঠানে সিপিবির এই নেতা সামগ্রিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি মনে করেন, কেবল নির্বাচনের মাধ্যমে মুখ বদল নয়, বরং সিস্টেম বা ব্যবস্থার পরিবর্তনই দেশকে সঠিক পথে নিয়ে যেতে পারে। তার এই বক্তব্য সুশীল সমাজ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।