থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সীমান্ত বিরোধ এবার এক চরম উত্তপ্ত রূপ ধারণ করেছে। দুই প্রতিবেশী দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মাঝেই বিতর্কিত সীমান্ত এলাকায় হিন্দু দেবতা বিষ্ণুর একটি বিশাল মূর্তি ধ্বংস করার খবর পাওয়া গেছে। গত সোমবার কম্বোডিয়া ভূখণ্ডের ভেতরে অবস্থিত এই ধর্মীয় স্থাপনাটি থাই কর্তৃপক্ষ গুঁড়িয়ে দিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই ঘটনার একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নতুন করে ভূ-রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বুলডোজারের আঘাতে ধূলিসাৎ ইতিহাস ও ধর্মীয় আবেগ
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এবং বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিতর্কিত এলাকায় অবস্থিত ইউনেস্কো (UNESCO) স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান 'প্রিয়াহ ভিহিয়ার' (Preah Vihear)-এর মুখপাত্র লিম চানপানহা এই ধ্বংসযজ্ঞের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মূর্তিটি কম্বোডিয়ার আন সেস এলাকায় অবস্থিত ছিল, যা থাইল্যান্ড সীমান্ত থেকে মাত্র ১০০ মিটার দূরত্বে।
২০১৪ সালে নির্মিত এই বিষ্ণু মূর্তিটি স্থানীয় বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ছিল। লিম চানপানহা অত্যন্ত কড়া ভাষায় এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেন, "প্রাচীন ঐতিহ্য এবং ধর্মীয় উপাসনালয় ধ্বংসের এই মানসিকতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।" তবে থাইল্যান্ড কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া বা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
এআই নয়, ভিডিওটি সত্য: নিশ্চিত করল এএফপি
মূর্তি ভাঙার একটি ভিডিও ক্লিপ সম্প্রতি বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ভাইরাল হয়। সেখানে দেখা যায়, একটি শক্তিশালী ‘ব্যাকহো লোডার’ (Backhoe Loader) ব্যবহার করে মূর্তিটি ভেঙে ধূলিসাৎ করা হচ্ছে। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির অপব্যবহার বা ডিপফেক ভিডিওর ছড়াছড়ি থাকলেও, বার্তা সংস্থা এএফপি তাদের ফ্যাক্ট-চেক রিপোর্টে জানিয়েছে, এই ভিডিওতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) ব্যবহারের কোনো লক্ষণ নেই। অর্থাৎ, ভিডিওটি সম্পূর্ণ সত্য এবং বাস্তবেই এই ধ্বংসলীলা চালানো হয়েছে।
ব্যাংককে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসের একজন প্রতিনিধি জানিয়েছেন যে, ধর্মীয় গুরুত্বসম্পন্ন এই স্থাপনা ধ্বংসের বিষয়ে নয়াদিল্লি এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সংঘাতের রক্তাক্ত প্রেক্ষাপট ও যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা
বিগত ১৬ দিন ধরে চলা এই ভয়াবহ সীমান্ত সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ৮৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। মূলত সীমানা নির্ধারণ এবং ঐতিহাসিক মন্দিরগুলোর মালিকানা নিয়ে দেশ দুটির মধ্যে কয়েক দশক ধরে বিরোধ চলে আসছে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই আজ বুধবার (২৪ ডিসেম্বর) থেকে জেনারেল বর্ডার কমিটির (General Border Committee) একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শুরু হতে যাচ্ছে।
থাই প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রিয়ার অ্যাডমিরাল সুরাসান্ত কংসিরি জানিয়েছেন, আগামী তিন দিন ধরে দুই দেশের সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা চলবে। এই আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হলো একটি কার্যকর ‘সিলজফায়ার’ (Ceasefire) বা যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছানো। আন্তর্জাতিক মহল আশা করছে, কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে এই রক্তক্ষয় বন্ধ হবে, তবে বিষ্ণু মূর্তি ধ্বংসের ঘটনা এই আলোচনার টেবিলে নতুন করে তিক্ততা সৃষ্টি করতে পারে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশী দেশের সংঘাত এখন কেবল ভূখণ্ড দখলের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ঐতিহাসিক এবং ধর্মীয় আবেগের এক জটিল স্তরে প্রবেশ করেছে।