ময়মনসিংহের ভালুকায় পোশাক কারখানার শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে মধ্যযুগীয় কায়দায় পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় তদন্তে বড় সাফল্য পেয়েছে পুলিশ। সিসিটিভি ফুটেজ (CCTV Footage) এবং ঘটনার সময় ধারণকৃত ভিডিও ফুটেজ নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করে এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ও উসকানি দেওয়ার অভিযোগে আরও ৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বুধবার রাতে যৌথ অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) দুপুরে তাদের আদালতে সোপর্দ করে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড (Remand) আবেদন করেছে পুলিশ।
গ্রেফতারকৃতদের পরিচয় ও অভিযানের বিবরণ
ময়মনসিংহ জেলা গোয়েন্দা (DB) পুলিশ ও ভালুকা থানা পুলিশের একটি চৌকস দল তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় হবিরবাড়ী এলাকায় অভিযান চালিয়ে এই ৬ জনকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতরা হলেন— মাদারীপুরের মাসুম খালাসী (২২), নোয়াখালীর সেলিম মিয়া (২২), ময়মনসিংহের শামীম মিয়া (২৮) ও নূর আলম (৩৩), ঠাকুরগাঁওয়ের রুহুল আমিন (৪২) এবং সুনামগঞ্জের তাকবির (২২)। পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, এই মামলায় এখন পর্যন্ত মোট ১৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
লোমহর্ষক সেই রাত: ‘মব জাস্টিসের’ নামে নৃশংসতা
নিহত দীপু চন্দ্র দাস (২৭) ভালুকার জামিরদিয়া ডুবালিয়াপাড়া এলাকার ‘পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেড’ কারখানায় কর্মরত ছিলেন। গত বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে এক তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে একদল উত্তেজিত জনতা তাকে লক্ষ্য করে ‘মব’ (Mob) সৃষ্টি করে। নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার পর তার নিথর দেহ মহাসড়কে নিয়ে গিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় এবং সেখানে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এই পৈশাচিক ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র নিন্দার ঝড় ওঠে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং যান চলাচল স্বাভাবিক করে।
তদন্তে উঠে এল উসকানিদাতাদের ভূমিকা
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেছেন। তিনি জানান, “গ্রেফতারকৃত আসামিরা কেবল ঘটনাস্থলে উপস্থিতই ছিল না, বরং তারা উচ্চকণ্ঠে স্লোগান দিয়ে সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত করে তুলেছিল। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, তারা সক্রিয়ভাবে ‘উসকানি’ (Instigation) দিয়ে জনতাকে ক্ষিপ্ত করে এবং লাশে আগুন দেওয়ার মতো জঘন্য কাজে নেতৃত্ব দেয়।”
পুলিশ আরও জানায়, এই ‘মব কিলিং’ বা গণপিটুনির ঘটনার নেপথ্যে কোনো সুগভীর ষড়যন্ত্র ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মামলার প্রেক্ষাপট ও বিচারিক প্রক্রিয়া
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর নিহতের ছোট ভাই অপু চন্দ্র দাস বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ১৪০ থেকে ১৫০ জনকে আসামি করে ভালুকা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ শুরু থেকেই ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অপরাধীদের শনাক্ত করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ময়মনসিংহের পুলিশ প্রশাসন সাফ জানিয়ে দিয়েছে, আইনের শাসনের বাইরে গিয়ে ‘মব জাস্টিসের’ নামে কাউকে কোনো অপরাধ সংঘটন করতে দেওয়া হবে না।
বর্তমানে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার পাশাপাশি বাকি আসামিদের ধরতে চিরুনি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।