পশ্চিম আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়ার বোর্নো (Borno) রাজ্যে পবিত্র উপাসনালয়ে ফের চলল রক্তস্নান। বুধবার (২৪ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় রাজধানী মাইদুগুরির একটি মসজিদে মাগরিবের নামাজ চলাকালীন এক ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। নামাজে সিজদারত অবস্থায় থাকা মুসল্লিদের ওপর চালানো এই বর্বরোচিত হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। ভয়াবহ এই বিস্ফোরণে গুরুতর আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৩৫ জন। স্থানীয় প্রশাসন এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স (Reuters) এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
নামাজের সময় অতর্কিত হামলা
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে যখন মুসল্লিরা মাগরিবের নামাজে নিমগ্ন ছিলেন, ঠিক তখনই বিকট শব্দে মসজিদটির ভেতরে বিস্ফোরণ ঘটে। নিমিষেই ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে চারপাশ। মাইদুগুরি শহরটি বোর্নো রাজ্যের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হওয়ায় এখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর থাকলেও, জনাকীর্ণ সময়ে এই আক্রমণটি চালানো হয়। প্রাথমিক তদন্ত শেষে স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, এটি একটি ‘Suicide Attack’ বা আত্মঘাতী হামলা হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
হতাহতের সংখ্যা ও চিকিৎসা
বিস্ফোরণের পরপরই উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে রক্তাক্ত অবস্থায় মুসল্লিদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হামলায় এখন পর্যন্ত পাঁচজনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে এবং ৩৫ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। হামলার তীব্রতায় মসজিদের একটি বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নেপথ্যে কারা: বোকো হারাম ও আইএসডব্লিউএপি-র ছায়া
এখন পর্যন্ত কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী এই নৃশংস হামলার দায় স্বীকার করেনি। তবে নাইজেরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সক্রিয় কুখ্যাত জঙ্গি সংগঠন বোকো হারাম (Boko Haram) এবং তাদের একটি শক্তিশালী শাখা ‘ইসলামিক স্টেট ওয়েস্ট আফ্রিকা প্রভিন্স’ (ISWAP)-এর ওপর সন্দেহের তীর যাচ্ছে। গত দুই দশক ধরে এই অঞ্চলে ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিদ্রোহ চালিয়ে আসছে বোকো হারাম। তাদের হামলায় এ পর্যন্ত হাজার হাজার সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন এবং কয়েক লাখ মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত (Displaced) হয়েছেন।
সন্ত্রাসবাদের করাল গ্রাসে মাইদুগুরি
বোর্নো রাজ্যের মাইদুগুরি শহরটি দীর্ঘকাল ধরে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এর আগেও এই শহরের বিভিন্ন জনাকীর্ণ বাজার এবং ধর্মীয় উপাসনালয়ে ‘Improvised Explosive Device’ (IED) ও আত্মঘাতী বোমা হামলা চালানো হয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে শুরু হওয়া এই বিদ্রোহ ও সহিংসতা নাইজেরিয়ার মানবিক পরিস্থিতিকে চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। নাইজেরীয় নিরাপত্তা বাহিনী জঙ্গিদের দমনে কাজ করে গেলেও, এই ধরনের অতর্কিত হামলা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
এই নারকীয় হামলার নিন্দা জানিয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা। একটি পবিত্র স্থানে ইবাদত চলাকালীন এমন রক্তক্ষয়ী আক্রমণকে ‘বর্বরোচিত এবং অমানবিক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়।