ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা মেঘনা নদীতে মধ্যরাতে ঘটে গেল এক ভয়াবহ নৌ-দুর্ঘটনা। চাঁদপুরের মেঘনা নদীতে দুটি যাত্রীবাহী লঞ্চের মুখোমুখি সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় নৌপথ। এই ঘটনায় বেশ কয়েকজন যাত্রী আহত হয়েছেন এবং একটি লঞ্চের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে সদর উপজেলার হরিণাঘাট এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। নিশ্ছিদ্র কুয়াশার কারণে ‘ভিজিবিলিটি’ (Visibility) কমে আসায় এই সংঘর্ষ হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
মুখোমুখি সংঘর্ষ ও ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ
চাঁদপুর বিআইডব্লিউটিএ (BIWTA) সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা থেকে বরিশালগামী এমভি অ্যাডভেঞ্চার-৯ এবং ভোলা থেকে সদরঘাটগামী এমভি জাকির সম্রাট-৩ লঞ্চ দুটি হরিণাঘাট এলাকায় পৌঁছালে ঘন কুয়াশার কবলে পড়ে। অত্যন্ত কাছাকাছি চলে আসায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে লঞ্চ দুটির মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।
সংঘর্ষের তীব্রতায় এমভি জাকির সম্রাট-৩ লঞ্চটির সম্মুখভাগ ও পার্শ্ববর্তী বেশ কিছু অংশ দুমড়েমুচড়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মাঝনদীতে হঠাৎ বিকট শব্দ আর তীব্র ঝাকুনিতে ঘুমন্ত যাত্রীদের মধ্যে হাহাকার ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষের সময় লঞ্চের ভেতরে ছিটকে পড়ে বেশ কয়েকজন যাত্রী গুরুতর আহত হন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে আহতদের সঠিক সংখ্যা নিশ্চিত করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
টার্মিনালে উত্তেজনা: যাত্রীদের আগুন দেওয়ার হুমকি
দুর্ঘটনার পর এমভি অ্যাডভেঞ্চার-৯ দ্রুত দুর্ঘটনাস্থল ত্যাগ করে বরিশালের দিকে যাত্রা অব্যাহত রাখে। তবে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এমভি জাকির সম্রাট-৩ লঞ্চটি নিয়ে বিপাকে পড়েন এর মাস্টার ও ক্রুরা। গভীর রাতে লঞ্চটি চাঁদপুর লঞ্চ টার্মিনালে ভেড়ানোর চেষ্টা করা হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
বিআইডব্লিউটিএ পরিদর্শক আব্দুল মান্নান জানান, ক্ষতিগ্রস্ত লঞ্চটি চাঁদপুরে ভেড়াতে চাইলে জীবনের নিরাপত্তাহীনতায় থাকা যাত্রীরা চরম ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে উত্তেজিত যাত্রীরা লঞ্চের স্টাফদের ওপর চড়াও হন এবং লঞ্চে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে লঞ্চ কর্তৃপক্ষ চাঁদপুর টার্মিনালে না ভিড়ে আহত যাত্রীদের নিয়ে সরাসরি ঢাকার সদরঘাটের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে বাধ্য হয়।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও নিরাপত্তা উদ্বেগ
চাঁদপুর নদী বন্দরের বিআইডব্লিউটিএর উপপরিচালক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান জানিয়েছেন, শীতকালীন এই সময়ে মেঘনা নদীতে ঘন কুয়াশার কারণে নৌ-চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, “দুর্ঘটনার বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছি এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিস্তারিত অবহিত করা হয়েছে। ঘন কুয়াশার সময় ফগ লাইট (Fog Light) ও আধুনিক রাডার (Radar) ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য চালকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”
নৌ-নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, যান্ত্রিক ত্রুটি বা কুয়াশায় নেভিগেশন (Navigation) সরঞ্জাম সঠিকভাবে ব্যবহার না করার ফলে এমন দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে। এই ঘটনায় আহতদের চিকিৎসার জন্য ঢাকার সদরঘাটে বিশেষ প্রস্তুতি রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মধ্যরাতের এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিভীষিকা নদীপথে যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে পুনরায় বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।