প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে পৌষের মাঝামাঝি এসে বাংলাদেশজুড়ে শুরু হয়েছে শীতের প্রবল দাপট। নীল আকাশকে আড়াল করে রাখা ঘন কুয়াশা আর হাড়কাঁপানো কনকনে উত্তুরে বাতাসের যুগলবন্দিতে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। গত কয়েক দিন ধরেই সূর্যের উত্তাপহীন ম্লান উপস্থিতি জনমনে কেবল একটি প্রশ্নই বারবার জাগিয়ে তুলছে—শীতের এই তীব্রতা কি আরও বাড়বে? দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে শীতের প্রকোপ এখন 'Extreme' পর্যায়ে পৌঁছেছে।
যশোরে রেকর্ড তাপমাত্রা: শৈত্যপ্রবাহের দাপট
শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) আবহাওয়া অধিদফতরের 'Daily Weather Report' অনুযায়ী, দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে যশোরে। সেখানে তাপমাত্রার পারদ নেমে এসেছে ৮.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। হিমালয় ছুঁয়ে আসা হিমেল বাতাসের সরাসরি প্রভাবে খুলনা ও রাজশাহী বিভাগের জেলাগুলো এখন কাঁপছে। শুধু যশোর নয়, উত্তরের জেলাগুলোতেও তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির নিচে অবস্থান করায় সেখানে 'Cold Wave' বা শৈত্যপ্রবাহের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
কুয়াশার চাদরে ঢাকা যোগাযোগ ব্যবস্থা ও 'Visibility' সংকট
ঘন কুয়াশা এখন যাতায়াত ব্যবস্থার জন্য এক অদৃশ্য দেয়ালে পরিণত হয়েছে। আবহাওয়া অফিসের আগামী ১২০ ঘণ্টার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, মধ্যরাত থেকে পরদিন দুপুর পর্যন্ত সারা দেশ মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা থাকবে। এই ঘন কুয়াশার কারণে 'Visibility' বা দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ায় দেশের Connectivity মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
আকাশপথ: ঘন কুয়াশায় রানওয়ে দেখা না যাওয়ায় ঢাকা ও সিলেটের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে ফ্লাইট ওঠানামায় বিঘ্ন ঘটছে।
নৌপথ: নদীমাতৃক বাংলাদেশে কুয়াশার কারণে ফেরি চলাচল বন্ধ রাখতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, ফলে ঘাটে সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট।
সড়কপথ: মহাসড়কগুলোতে হেডলাইট জ্বালিয়েও কয়েক হাত দূরের পথ দেখা দুষ্কর হয়ে পড়েছে, যা সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
কেন বাড়ছে ঠান্ডার অনুভূতি?
আবহাওয়াবিদদের মতে, কেবল তাপমাত্রা কমলেই শীত অনুভূত হয় না; দিন ও রাতের তাপমাত্রার ব্যবধান কমে আসায় শীতের অনুভূতি আরও প্রকট হচ্ছে। কুয়াশার কারণে সূর্যের আলো ভূপৃষ্ঠে পৌঁছাতে বাধাগ্রস্ত হওয়ায় দিনের বেলাতেও রোদের উত্তাপ পাওয়া যাচ্ছে না। এই 'Diurnal Variation' বা তাপমাত্রার ক্ষুদ্র পার্থক্যের কারণেই কনকনে ঠান্ডার অনুভূতি দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানানো হয়েছে, আগামী কয়েক দিন তাপমাত্রা কমার বড় কোনো সম্ভাবনা না থাকলেও ঠান্ডার এই তীব্রতা আপাতত কমছে না।
বিপর্যস্ত প্রান্তিক জনজীবন ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি
শহরের ইট-পাথরের দেয়াল কিছুটা রক্ষা দিলেও গ্রামাঞ্চল ও বস্তি এলাকায় মানুষের ভোগান্তি চরমে। তীব্র শীতে বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে 'Cold Related Diseases' বা শীতকালীন রোগের প্রকোপ বাড়ছে। খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের দৃশ্য এখন মফস্বলের চিরচেনা চিত্র। প্রান্তিক মানুষের জন্য পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র ও সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সহায়তার প্রয়োজনীয়তা এখন জরুরি হয়ে দেখা দিয়েছে।
আপাতত প্রকৃতির এই রুদ্র শীতল রূপ থেকে দ্রুত মুক্তির কোনো সংকেত দিচ্ছে না আবহাওয়া মানচিত্র। ফলে হাড়কাঁপানো এই ঠান্ডা মোকাবিলায় সাধারণ মানুষকে আরও কয়েক দিন সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।