রাজধানীর শাহবাগ মোড় এখন এক অগ্নিগর্ভ প্রতিবাদী জনপদে পরিণত হয়েছে। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরীফ ওসমান হাদির খুনিদের অবিলম্বে গ্রেফতার এবং এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা মূল পরিকল্পনাকারীদের (Masterminds) চিহ্নিত করার দাবিতে দ্বিতীয় দিনের মতো অবরুদ্ধ হয়ে আছে ঢাকার এই প্রধান মোড়টি। শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) দুপুর সাড়ে ১২টায় ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা পুনরায় শাহবাগের ‘শহীদ হাদি চত্বরে’ অবস্থান নিলে ওই এলাকায় যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
আন্দোলনের ধারাবাহিকতা ও ‘শহীদ হাদি চত্বর’
উল্লেখ্য, গত শুক্রবার জুমার নামাজের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেন ইনকিলাব মঞ্চের হাজার হাজার কর্মী-সমর্থক। ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবেরের কড়া ঘোষণা অনুযায়ী, অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথ ছাড়বেন না। সেই অঙ্গীকার থেকে শুক্রবার কনকনে শীতের রাতও তারা শাহবাগের খোলা আকাশের নিচে যাপন করেন। আন্দোলনকারীরা এখন এই মোড়টির নাম দিয়েছেন ‘শহীদ হাদি চত্বর’।
তারেক রহমানের আগমন ও সাময়িক কৌশলগত পরিবর্তন
শনিবার সকালে এক বিশেষ পরিস্থিতিতে আন্দোলনকারীরা সাময়িকভাবে শাহবাগ মোড় ছেড়ে কিছুটা দূরে সরে যান। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ শরীফ ওসমান হাদির কবর জিয়ারত করতে আসার কর্মসূচি থাকায় তাঁর নিরাপত্তা এবং যাতায়াতের পথ সুগম করতে ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা আজিজ সুপার মার্কেটের সামনে অবস্থান নেন। এই সময়টিতে শাহবাগ এলাকায় ব্যাপক ‘Security Protocol’ বা নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়। তারেক রহমানের জিয়ারত ও রাজনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পরপরই, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ফের আকাশ-বাতাস কাঁপানো স্লোগান দিয়ে শাহবাগ মোড়ের মূল পয়েন্ট দখলে নেন বিক্ষোভকারীরা।
হাদি হত্যাকাণ্ড: শোক থেকে দ্রোহের জন্ম
গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পল্টনে এক অতর্কিত হামলায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে বিদ্ধ হন ইনকিলাব মঞ্চের অন্যতম কাণ্ডারি ও তরুণ তুর্কি শরীফ ওসমান হাদি। সংকটাপন্ন অবস্থায় (Critical Condition) তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হলেও দীর্ঘ ৬ দিনের যন্ত্রণাদায়ক লড়াই শেষে গত ১৮ ডিসেম্বর তিনি শাহাদতবরণ করেন। হাদির এই অকাল মৃত্যু দেশের ছাত্র-জনতার মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে, যা এখন রাজপথের ‘Mass Movement’ বা গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছে।
প্রশাসনের প্রতি চরমপত্র: বিচারহীনতার সংস্কৃতি রুখতে হবে
আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার দাবি স্পষ্ট—হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত হোতাদের আড়াল করার কোনো ‘Administrative Loophole’ বা অপচেষ্টা বরদাশত করা হবে না। ইনকিলাব মঞ্চের নেতাদের মতে, এই হত্যাকাণ্ড কেবল একজন ব্যক্তির ওপর হামলা নয়, বরং মুক্তিকামী মানুষের কণ্ঠরোধের এক অশুভ প্রয়াস। তাঁরা সাফ জানিয়েছেন, সরকারের পক্ষ থেকে খুনিদের গ্রেফতারের বিষয়ে দৃশ্যমান এবং কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না আসা পর্যন্ত শাহবাগ মোড়ের এই অবরোধ কর্মসূচি নিরবচ্ছিন্নভাবে চলবে।
শাহবাগের এই দীর্ঘস্থায়ী অবরোধের ফলে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থায় এক বড় ধরনের ‘Gridlock’ বা অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। তবে আন্দোলনকারীরা বলছেন, ইনসাফ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এই লড়াইয়ে সাময়িক ভোগান্তি মেনে নিয়েই তাঁরা চূড়ান্ত বিজয়ের লক্ষ্য অভিমুখে এগিয়ে যাচ্ছেন।