দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম যেন রকেট গতিতে ছুটছে। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে এবার ইতিহাসের সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছেছে মূল্যবান এই ধাতু। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) ফের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়ায় আজ (রোববার, ২৮ ডিসেম্বর) থেকে কার্যকর হচ্ছে নতুন এই ‘Historical High’ মূল্য তালিকা। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভালো মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ কিনতে এখন সাধারণ গ্রাহককে গুনতে হবে ২ লাখ ২৭ হাজার টাকারও বেশি।
রেকর্ড উচ্চতায় স্বর্ণের বাজারদর
সবশেষ শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) রাতে দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে বাজুস জানায়, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (Pure Gold) মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় এই সমন্বয় করা হয়েছে। নতুন তালিকায় ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম ১ হাজার ৫৭৪ টাকা বাড়িয়ে ২ লাখ ২৭ হাজার ৮৫৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশের ইতিহাসে এর আগে কখনোই স্বর্ণের দাম এই পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
অন্যান্য মানের স্বর্ণের দামও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। নতুন দর অনুযায়ী:
২১ ক্যারেট: প্রতি ভরি ২ লাখ ১৭ হাজার ৫৩৪ টাকা।
১৮ ক্যারেট: প্রতি ভরি ১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৪৯ টাকা।
সনাতন পদ্ধতি: প্রতি ভরি ১ লাখ ৫৫ হাজার ৪২৩ টাকা।
অতিরিক্ত খরচ: ভ্যাট ও মজুরি
তবে ক্রেতাদের মনে রাখা প্রয়োজন, বাজুস নির্ধারিত এই দামের সঙ্গেই যুক্ত হবে সরকারি আইন অনুযায়ী ৫ শতাংশ ভ্যাট (VAT) এবং বাজুস নির্ধারিত ন্যূনতম ৬ শতাংশ মজুরি (Making Charge)। ফলে গয়না কিনতে গেলে প্রকৃত বাজারমূল্য বা ‘Market Value’ ভরিপ্রতি প্রায় আড়াই লাখ টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারে। গহনার ডিজাইন ও কারুকার্যের ওপর ভিত্তি করে মজুরির তারতম্য হতে পারে বলেও জানানো হয়েছে।
অস্থির বাজার: এক বছরে ৯০ বার সমন্বয়
স্বর্ণের বাজারের এই অস্থিরতা বিশ্লেষণ করলে এক বিস্ময়কর চিত্র ফুটে ওঠে। চলতি ২০২৫ সালে এখন পর্যন্ত মোট ৯০ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে অবিশ্বাস্যভাবে ৬৩ বার দাম বাড়ানো হয়েছে এবং মাত্র ২৭ বার কমানো হয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালে মোট ৬২ বার দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। অর্থাৎ, বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদার কারণে স্বর্ণের বাজারে এখন এক চরম ‘Volatility’ বা অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে।
সবশেষ গত ২৩ ডিসেম্বর স্বর্ণের দাম বাড়ানো হয়েছিল, যা ২৪ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছিল। মাত্র চার দিনের মাথায় আবারও দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে এই সম্পদ।
রুপার দামেও বড় লাফ
স্বর্ণের পাশাপাশি এবার রেকর্ড গড়েছে রুপার দামও। ভরিতে ৯৩৩ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ হাজার ৬৫ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেট ৫ হাজার ৭৭৪ টাকা এবং ১৮ ক্যারেট ৪ হাজার ৯৫৭ টাকায় দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ১৩ বার রুপার দাম সমন্বয় করা হয়েছে, যার মধ্যে ১০ বারই ছিল ঊর্ধ্বমুখী।
কেন এই আকাশছোঁয়া দাম?
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের বিপরীতে স্বর্ণের চাহিদা বৃদ্ধি এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ‘Global Market’-এ গোল্ড ফিউচার ক্রমাগত শক্তিশালী হচ্ছে। এছাড়া স্থানীয় বাজারে সরবরাহ সংকটের কারণেও বারবার দামের এই ‘Adjustment’ করতে হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের কাছে স্বর্ণ কেবল অলংকার নয়, বরং নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবেও পরিচিত। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ ক্রেতারা এখন বিকল্প চিন্তা করতে বাধ্য হচ্ছেন।