• দেশজুড়ে
  • ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ানো প্রকৃতির অলংকার 'তিলাইয়া' প্রজাপতি: পরিবেশের নীরব রক্ষক

ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ানো প্রকৃতির অলংকার 'তিলাইয়া' প্রজাপতি: পরিবেশের নীরব রক্ষক

কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় দেখা মেলে কমন পিয়েরোট বা সাজুন্তি নামের এই প্রজাপতির। এরা পরাগায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। তবে কীটনাশক ও বাসস্থান সংকটে এদের অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে।

দেশজুড়ে ১ মিনিট পড়া
ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ানো প্রকৃতির অলংকার 'তিলাইয়া' প্রজাপতি: পরিবেশের নীরব রক্ষক

প্রকৃতির বুকে শূন্যে উড়ে বেড়ানো রঙিন প্রজাপতিরা যেন এক জীবন্ত কাব্য। সৌন্দর্যের প্রতীক হওয়ার পাশাপাশি এরা প্রকৃতির ভারসাম্যের নীরব রক্ষক ও পরিবেশের স্বাস্থ্যকর অবস্থার নির্দেশক। তেমনই চোখ জুড়ানো এক অনিন্দ্যসুন্দর প্রজাপতি হলো 'তিলাইয়া', যা কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়াসহ দক্ষিণ এশিয়ার গ্রামীণ প্রকৃতিকে প্রাণবন্ত করে রেখেছে। আকারে ছোট হলেও এর সৌন্দর্য ও পরিবেশগত গুরুত্ব অপরিসীম।

প্রকৃতির অলংকার হিসেবে পরিচিত তিলাইয়া প্রজাপতি গ্রাম বাংলার সবুজ মাঠ, ঝোপঝাড় ও নদী পাড়ে হঠাৎ চোখ পড়লে চারপাশের দৃশ্যপট পাল্টে দেয়। এই ছোট প্রাণীগুলো শুধু মুগ্ধতার অনুভূতিই এনে দেয় না, পরিবেশের ভালো-মন্দ অবস্থারও সংকেত দেয়।

তিলাইয়া প্রজাপতির পরিচিতি ও বৈশিষ্ট্য

তিলাইয়া প্রজাপতির বৈজ্ঞানিক নাম ক্যাস্টালিয়াস রোসিমন (Castalius rosimon) এবং ইংরেজি নাম কমন পিয়েরোট (Common Pierrot) বা ব্ল্যাক-স্পটেড পিয়েরোট। এটি 'সাজুন্তি' নামেও পরিচিত। লাইসিনিডি পরিবারভুক্ত এই ছোট আকারের প্রজাপতির দেহের রঙ সাদা এবং তাতে অসংখ্য ছোট-বড় কালো ফোঁটার মতো ছোপ বা চিহ্ন রয়েছে। এই কালো ফোঁটার জন্যই এদের নামকরণ হয়েছে তিলাইয়া।

তিলাইয়ার মুখমণ্ডল সাদা এবং চোখ কালো। এদের সামনের ডানার নিচের দিকে সাদা রঙের ওপর বিভিন্ন আকারের ফোঁটা বা দাগ সুন্দরভাবে সাজানো থাকে। পেছনের ডানার কেন্দ্রে কোনো ফোঁটা না থাকলেও নিচের প্রান্তে গোড়ার দিকে একটি উজ্জ্বল সবুজ গোলাকার ফোঁটা দেখা যায়। এদের পিছনের ডানায় খুব সরু, কালো ও সাদায় মেশানো একটি লেজ থাকে। ডানা ওপর দিক থেকে দেখলে গোড়ার অংশ ধাতব সবুজ দেখায়। পুরুষ ও স্ত্রী প্রজাপতি দেখতে একইরকম হয়।

তিলাইয়ার বিচরণ ও পরিবেশগত গুরুত্ব

তিলাইয়া প্রজাপতিরা রাস্তার ধারে জন্মানো ফুল, ক্ষেতের আগাছা, বিভিন্ন ঝোপঝাড়, জলাশয়ের পাড়ের ছোট গাছগাছালি কিংবা বাড়ির আঙিনার লতানো গাছসহ প্রায় সবখানেই অবাধে বিচরণ করে। এদের সকালের নরম রোদে ফুলের ওপর বসে মধু আহরণ করতে দেখা যায়। এই মধু আহরণের সময় এরা ফুলের পরাগায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যা ফসল উৎপাদনে সহায়ক এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখে। পরিবেশবিদদের মতে, কোনো এলাকায় প্রজাপতির উপস্থিতি সেই এলাকার পরিবেশের স্বাস্থ্যকর অবস্থার ইঙ্গিত দেয়।

সংকট ও সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির পরিবর্তনের কারণে তিলাইয়া প্রজাপতির মতো সংবেদনশীল প্রাণীরা হুমকির মুখে পড়ছে। স্থানীয় প্রকৃতিপ্রেমীরা অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার, গাছপালা ও ঝোপঝাড় কমে যাওয়া এবং জলাভূমি ভরাটের মতো কর্মকাণ্ডকে এই প্রজাপতির অস্তিত্ব সংকটের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন।

প্রকৃতিপ্রেমী ও প্রাক্তন স্কুলশিক্ষক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, প্রজাপতি শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, পরিবেশের ভারসাম্য ও সুস্থতার বার্তাবাহকও। তাঁর মতে, সুন্দর প্রজাপতিদের রক্ষায় কম কীটনাশক ব্যবহার এবং প্রকৃতিবান্ধব জীবনযাপন জরুরি। কৃষিবিদ মো. মাসুদ রানা আরও যোগ করেন যে শুঁয়াপোকা গাছের পাতা খেয়ে ফসলের ক্ষতি করলেও, পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতিরা পরাগায়নে সহায়ক হয়ে আমাদের কৃষি ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উপকারী। প্রকৃতি ও পরিবেশের এই অলংকারকে বাঁচাতে এখনই সচেতনতা বৃদ্ধি ও সবুজ সংরক্ষণ জরুরি।

Tags: bangladesh cumilla environment butterfly common pierrot castalius rosimon nature conservation pollination