বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু এখন ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো রিসোর্ট। দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানে একটি সম্ভাব্য ‘শান্তি চুক্তি’ (Peace Deal) বা যুদ্ধবিরতির আলোচনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। স্থানীয় সময় রোববার (২৮ ডিসেম্বর) ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তবে একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেছেন যে, ভূখণ্ডগত বিরোধ, বিশেষ করে বিতর্কিত দনবাস অঞ্চল এখনো আলোচনার টেবিলে সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ও ৯৫ শতাংশ অগ্রগতি
সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প ও জেলেনস্কি দুজনেই শান্তি আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ দুটি দিক—ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা (Security Guarantee) এবং পূর্ব ইউক্রেনের দনবাস অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিয়ে ইতিবাচক অগ্রগতির কথা জানান। ট্রাম্পের মতে, নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে প্রায় ৯৫ শতাংশ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, এই ক্ষেত্রে ইউরোপীয় দেশগুলো প্রধান ভূমিকা পালন করবে এবং যুক্তরাষ্ট্র তাদের কৌশলগত সমর্থন (Strategic Support) দিয়ে যাবে।
ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিও দাবি করেছেন যে, দীর্ঘ আলোচনার পর একটি কার্যকর নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। তবে ট্রাম্প কিছুটা সতর্ক অবস্থানে থেকে জানান, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পরিষ্কার হবে যে এই যুদ্ধ সত্যিই থামছে কি না।
মার-এ-লাগো থেকে প্যারিস: নতুন কূটনৈতিক তৎপরতা
ট্রাম্প-জেলেনস্কি বৈঠকের পর আন্তর্জাতিক মহলে নতুন চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) জানিয়েছেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তিনি আরও জানান, তথাকথিত ‘কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং’ (Coalition of the Willing)-এর অন্তর্ভুক্ত দেশগুলো আগামী জানুয়ারির শুরুতে প্যারিসে এক জরুরি বৈঠকে বসবে। সেখানে ইউক্রেনের নিরাপত্তায় দেশগুলোর ‘সুনির্দিষ্ট অবদান’ চূড়ান্ত করা হবে। এটি একটি বড় ধরণের ভূ-রাজনৈতিক (Geopolitical) পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের দীর্ঘ ফোনালাপ
জেলেনস্কির সঙ্গে সাক্ষাতের কয়েক ঘণ্টা আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রুশ রাষ্ট্রদূত ইউরি উশাকভ জানিয়েছেন, প্রায় ১ ঘণ্টা ১৫ মিনিটের এই ফোনালাপ ছিল অত্যন্ত ‘বন্ধুত্বপূর্ণ ও কার্যকর’। ট্রাম্প তার নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এই আলাপকে ফলপ্রসূ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। দুই নেতাই একটি স্থায়ী ও টেকসই শান্তিপূর্ণ সমাধানে পৌঁছাতে তাদের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির বিরোধিতা ও ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ’ গঠন
মজার বিষয় হলো, ট্রাম্প এবং পুতিন—উভয় নেতাই ইউক্রেন ও ইউরোপীয় মিত্রদের প্রস্তাবিত সাময়িক বা অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তাদের মতে, একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কেবল সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করবে এবং ভবিষ্যতে নতুন করে বড় কোনো যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করবে। এই সংকট নিরসনে এবং নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক (Security and Economy) বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে ট্রাম্পের প্রস্তাবে পুতিন দুটি পৃথক ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ’ (Working Group) গঠনে সম্মত হয়েছেন। জেলেনস্কির সঙ্গে আলোচনার পর ট্রাম্প আবারও পুতিনের সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানা গেছে।
অমীমাংসিত দনবাস ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে এগোলেও ‘দনবাস’ (Donbas) ইস্যুটি এখনো একটি বড় ‘Diplomatic Deadlock’ হিসেবে রয়ে গেছে। রাশিয়া এই অঞ্চলের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে নারাজ, অন্যদিকে ইউক্রেন তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অনড়। ট্রাম্পের ভাষায়, "ভূখণ্ড সংক্রান্ত কিছু জটিল ইস্যু এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।"
সার্বিকভাবে, ট্রাম্পের এই মধ্যস্থতা কি সত্যিই ইউক্রেনে শান্তির সুবাতাস বইয়ে দেবে, নাকি এটি নতুন কোনো কূটনৈতিক মারপ্যাঁচ—তা সময়ই বলে দেবে। তবে জানুয়ারিতে প্যারিসের বৈঠক এবং পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ বিশ্ব রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।