তামিল চলচ্চিত্রের আকাশে আজ এক যুগের অবসান হলো। রূপালি পর্দার গ্ল্যামার, কোটি টাকার পারিশ্রমিক আর আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা—সবকিছুকে তুচ্ছ করে রাজনীতির কণ্টকাকীর্ণ পথে হাঁটার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলেন ‘থালাপতি’ বিজয়। মাত্র ৫১ বছর বয়সেই অভিনয়ের আঙিনা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার এই ঘোষণা চলচ্চিত্র বিশ্বকে স্তম্ভিত করলেও তার অগণিত ভক্ত বা ‘Fanbase’-এর কাছে এটি এক নতুন আশার আলো।
অভিনয় জীবনের যবনিকা: মালয়েশিয়ার মঞ্চে আবেগঘন বিদায়
রোববার (২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫) মালয়েশিয়ার বুকিত জলিল ন্যাশনাল স্টেডিয়ামে বিজয়ের সর্বশেষ চলচ্চিত্র ‘জানা নায়কগান’-এর অডিও ও টিজার লঞ্চ অনুষ্ঠানে এক আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সেখানে থালাপতি বিজয় আনুষ্ঠানিকভাবে তার দীর্ঘ ৩৩ বছরের অভিনয় জীবনের ইতি টানার ঘোষণা দেন।
বিদায়লগ্নে মঞ্চে দাঁড়িয়ে অভিনেতা অত্যন্ত সিক্ত কণ্ঠে বলেন, “গত তিন দশক ধরে আপনারা আমাকে যে ভালোবাসা দিয়েছেন, আমি তা মাথা পেতে নিয়েছি। আপনারা ছাড়া বিজয় অসম্পূর্ণ। গত ৩৩ বছর আমি আপনাদের ভালোবাসা গ্রহণ করেছি, আর জীবনের আগামী ৩৩ বছর আমি আপনাদের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিতে চাই। এটিই হবে আপনাদের ভালোবাসার ঋণ শোধ করার সেরা উপায়।”
শিশুশিল্পী থেকে বক্স অফিস কিং: এক সোনালী সফর
যোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর থেকে ‘থালাপতি’ বিজয় হয়ে ওঠার পথটি সহজ ছিল না। মাত্র ১০ বছর বয়সে শিশুশিল্পী হিসেবে পর্দার সামনে আসা এই কিশোর একদিন দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রের ‘Undisputed Superstar’ হয়ে উঠবেন, তা হয়তো অনেকেই ভাবেননি। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে একের পর এক ‘Blockbuster’ সিনেমা উপহার দিয়ে তিনি নিজেকে নিয়ে গেছেন অন্য উচ্চতায়। ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে থাকা অবস্থায় এমন ‘Retirement’ ঘোষণা ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে বিরল। বিজয় অকপটে স্বীকার করেন যে, ক্যারিয়ারের দীর্ঘ পথে তাকে বহুবার নেতিবাচক সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে, তবে ভক্তদের নিঃস্বার্থ সমর্থনই তাকে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দিয়েছে।
চেন্নাই বিমানবন্দরে উন্মাদনা: নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেঙে পড়ে গেলেন বিজয়
মালয়েশিয়া থেকে চেন্নাইয়ে ফেরার পথে বিমানবন্দরে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। প্রিয় তারকার বিদায়ের খবরে বিমানবন্দরে কয়েক হাজার ভক্তের ঢল নামে। থালাপতিকে একবার দেখার জন্য ভক্তদের প্রবল হুড়োহুড়িতে বিমানবন্দরের নিরাপত্তাবেষ্টনী বা ‘Security Ring’ ভেঙে যায়। জনতার চাপে ভারসাম্য হারিয়ে টার্মিনালের মেঝেতে পড়ে যান অভিনেতা। যদিও নিরাপত্তাকর্মীরা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে নিরাপদে গাড়িতে তুলে দেন, তবে এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করেছে যে বিজয়ের প্রতি সাধারণ মানুষের আবেগ কতটা তীব্র।
তামিলাগা ভেটরি কাজাগম: রূপালি পর্দা থেকে রাজনীতির ময়দানে
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেই বিজয় তার নিজস্ব রাজনৈতিক দল ‘তামিলাগা ভেটরি কাজাগম’ (TVK) গঠনের মাধ্যমে তার ‘Political Debut’-এর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। দল ঘোষণার মাত্র ৯ মাসের মাথায় তিনি তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে এক প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হয়েছেন। গত অক্টোবর মাসে তার দলের প্রথম জনসভায় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং বিপুল জনসমর্থন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাবিয়ে তুলেছে।
অনেকেই মনে করছেন, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজয় একটি বড় ‘Factor’ হয়ে দাঁড়াবেন। বিপুল পারিশ্রমিক ও তারকাখ্যাতি ত্যাগ করে বিজয়ের এই রাজনীতিতে নামার সিদ্ধান্তকে তামিলনাড়ুর সাধারণ মানুষ অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দেখছে। রূপালি পর্দার ‘থালাপতি’ এখন বাস্তবের ‘Mass Leader’ হওয়ার পথে।
চলচ্চিত্রের রঙিন আলো থেকে দূরে সরে গিয়ে এখন তিনি সাধারণ মানুষের অধিকার ও কল্যাণের লড়াইয়ে কান্ডারি হতে চান। বিজয়ের এই নতুন পথচলা ভারতের বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে কোনো গুণগত পরিবর্তন আনে কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।