বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে চিরবিদায় নিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর এই প্রয়াণে দেশজুড়ে শোকের আবহ বিরাজ করছে, যার ঢেউ লেগেছে সংস্কৃতি ও শোবিজ অঙ্গনেও। এই মহীয়সী নারীর মৃত্যুতে গভীর শোক ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী, স্থপতি ও নির্মাতা মেহের আফরোজ শাওন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বেগম জিয়াকে নব্বইয়ের দশকের এক ‘সফল প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে স্মরণ করেন।
শাওনের স্মৃতিতে নব্বইয়ের দশক ও সফল নেতৃত্বের প্রতিচ্ছবি
নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক হ্যান্ডেলে মেহের আফরোজ শাওন বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি আবেগঘন পোস্ট দেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, নব্বইয়ের দশকে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের কাছে খালেদা জিয়া ছিলেন এক শক্তিশালী প্রভাব। শাওন লেখেন, “নব্বই দশকে আমাদের প্রজন্ম আপনাকে মনে রাখবে ভালো-মন্দ নানা কারণে। তবে আমি ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সালের শাসনামলে সফল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আপনার কথা মনে রাখতে চাই।”
শাওনের এই বক্তব্যে উঠে এসেছে বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে বেগম জিয়ার প্রথম মেয়াদের সেই সময়কাল, যা দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছিল। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের Political History-তে ওই পাঁচটি বছর ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং বেগম জিয়ার সেই সময়কার নেতৃত্ব আজও অনেকের মনে গেঁথে আছে।
নারী নেতৃত্বের অগ্রদূত ও আপসহীন ব্যক্তিত্ব
মেহের আফরোজ শাওন তাঁর স্ট্যাটাসে বেগম খালেদা জিয়ার বৈপ্লবিক ভূমিকার কথা স্মরণ করে তাঁকে নারী নেতৃত্বের পথিকৃৎ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের প্রথম নারী সরকারপ্রধান হিসেবে বেগম জিয়া দেশে নারী উন্নয়নের যে ধারার সূচনা করেছিলেন, তা এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বা Benchmark হয়ে থাকবে।
শাওনের মতে, বেগম জিয়া কেবল একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেত্রীই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন এ দেশের রাজনীতির এক অদম্য শক্তি। তাঁর আপসহীন অবস্থান এবং সাহসিকতা এ দেশের Democratic Movement বা গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। শাওন বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশের নারী রাজনীতিবিদের জন্য তিনি সম্ভাবনার এক নতুন দুয়ার উন্মোচন করে দিয়েছিলেন।
হাসপাতালে শেষ লড়াই ও রোগশয্যার দিনগুলি
মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বেগম খালেদা জিয়া। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি লিভার ও কিডনি জটিলতা, হৃদরোগ (Heart Disease), উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও আথ্রাইটিসসহ বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক সমস্যার সঙ্গে লড়াই করছিলেন।
চিকিৎসা সূত্রে জানা গেছে, গত ২৩ নভেম্বর তাঁকে বসুন্ধরার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২৭ নভেম্বর তাঁর ফুসফুসে সংক্রমণ (Lung Infection) ছড়িয়ে পড়লে শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে ‘Critical Care Unit’ (CCU)-তে স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত না ফেরার দেশে চলে যান এই প্রবীণ জননেত্রী।
ফিরে দেখা: বর্ণাঢ্য এক রাজনৈতিক জীবন
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্ম নেওয়া বেগম খালেদা জিয়ার শিকড় ছিল ফেনী জেলায়। তাঁর বাবা ইস্কান্দার মজুমদার এবং মা তৈয়বা বেগমের পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। সেনাপ্রধান ও প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী থেকে রাজনীতির ময়দানে তাঁর আবির্ভাব ছিল নাটকীয় ও স্বতঃস্ফূর্ত।
বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে তিনবার (১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে) প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়াও ১৯৯৬ ও ২০০৯ সালে তিনি জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে তিনি যেমন অগণিত মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন, তেমনি মোকাবিলা করেছেন নানামুখী প্রতিকূলতা।
মেহের আফরোজ শাওন তাঁর বার্তার শেষাংশে বেগম জিয়ার বিদেহী আত্মার শান্তি ও মাগফেরাত কামনা করে লেখেন, “বাংলাদেশের প্রথম নারী সরকারপ্রধান বেগম খালেদা জিয়া, আপনার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি।” শাওনের এই পোস্টটি নেটিজেনদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে এবং শোকের এই মুহূর্তে দেশের আপামর জনসাধারণের আবেগেরই প্রতিফলন ঘটিয়েছে।