• দেশজুড়ে
  • বরিশালে পালিত কন্যার ওপর পাশবিক নির্যাতন: গৃহকর্ত্রী গ্রেপ্তার, পলাতক লম্পট মামা

বরিশালে পালিত কন্যার ওপর পাশবিক নির্যাতন: গৃহকর্ত্রী গ্রেপ্তার, পলাতক লম্পট মামা

দেশজুড়ে ১ মিনিট পড়া
বরিশালে পালিত কন্যার ওপর পাশবিক নির্যাতন: গৃহকর্ত্রী গ্রেপ্তার, পলাতক লম্পট মামা

দত্তক নেয়ার আড়ালে এক দশকের দুঃস্বপ্ন; শারীরিক ও যৌন নিপীড়ন সইতে না পেরে ঘর ছেড়েছিল কিশোরী মিম।

বরিশাল নগরীর পুলিশ লাইন এলাকায় মানবিকতার আবরণে লুকিয়ে থাকা এক বিভীষিকাময় অধ্যায়ের উন্মোচন হয়েছে। দীর্ঘ ১০ বছর আগে পরম মমতায় দত্তক নেওয়া কন্যাশিশুকে লালন-পালনের বদলে পৈশাচিক শারীরিক নির্যাতন ও যৌন হয়রানির অভিযোগে আটক হয়েছেন গৃহকর্ত্রী এ্যাডলিন বিশ্বাস (৩৫)। একই ঘটনায় অভিযুক্ত লম্পট মামা জনি বিশ্বাস (৩০) পলাতক রয়েছেন। পুলিশ ভুক্তভোগী কিশোরীকে উদ্ধার করে বর্তমানে ‘সেফ কাস্টডি’ বা নিরাপদ হেফাজতে রেখেছে।

নিখোঁজ সংবাদ থেকে লোমহর্ষক সত্যের উন্মোচন

ঘটনার সূত্রপাত হয় সম্প্রতি, যখন গৃহকর্ত্রী এ্যাডলিন বিশ্বাস তাঁর পালিত কন্যা এনজেল অধিকারী মিম নিখোঁজ হয়েছে মর্মে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (GD) করেন। চতুরতার আশ্রয় নিয়ে তিনি নিজের গৃহপরিচারিকার বিরুদ্ধে অপহরণের মিথ্যা মামলাও দায়ের করেন। তবে সত্য বেরিয়ে আসে গত ২৮ ডিসেম্বর। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কোতোয়ালি থানা পুলিশ নগরীর দুর্গাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন একটি বাসা থেকে মিমকে উদ্ধার করে। স্থানীয়রা শিশুটির আচরণে অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করে তাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। উদ্ধারের পর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে দীর্ঘ এক দশকের ‘Child Abuse’ বা শিশু নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা।

দত্তকের আড়ালে দাসের জীবন

মামলার বিবরণ ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১০ বছর আগে বরিশাল পোর্ট রোড এলাকার বাসিন্দা মরিয়ম আক্তারের এক বছর বয়সী কন্যাকে দত্তক নেন ড্যান অধিকারী ও এ্যাডলিন বিশ্বাস দম্পতি। নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় এনজেল অধিকারী মিম। তবে অভিযোগ রয়েছে, দত্তক নেওয়ার পর থেকেই শিশুটির ‘Biological Mother’ বা জন্মদাত্রী মায়ের সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় এই দম্পতি।

আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে কিশোরী মিম জানায়, বাড়িতে কাজের লোক থাকা সত্ত্বেও তাকে দিয়ে অমানবিক ও কঠোর পরিশ্রম করানো হতো। সামান্য ভুল হলেই চলত মধ্যযুগীয় কায়দায় শারীরিক নির্যাতন। গৃহকর্ত্রী এ্যাডলিন বিশ্বাস প্রায়শই তাকে নির্দয়ভাবে মারধর করতেন।

যৌন হয়রানির শিকার: পলাতক অভিযুক্ত জনি

নির্যাতনের মাত্রা কেবল শারীরিক প্রহারেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মিমের জবানবন্দি অনুযায়ী, ওই বাড়িতে বসবাসকারী এ্যাডলিনের ভাই জনি বিশ্বাস দীর্ঘ দিন ধরে তাকে ‘Sexual Harassment’ বা যৌন হয়রানি করে আসছিলেন। বিভিন্ন অজুহাতে নিজের কক্ষে ডেকে নিয়ে শিশুটিকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করতেন তিনি। এই দ্বিবিধ নরক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরেই গত সপ্তাহে সুযোগ বুঝে বাসা থেকে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করে মিম। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে জনি বিশ্বাস বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।

আইনি পদক্ষেপ ও পুলিশের বক্তব্য

মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) আটক এ্যাডলিন বিশ্বাসকে সংশ্লিষ্ট মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। বরিশাল কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (OC) আল মামুন উল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, “প্রাথমিক তদন্তে আমরা নির্যাতনের সত্যতা পেয়েছি। ভুক্তভোগী কিশোরীর জবানবন্দি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। পলাতক আসামি জনি বিশ্বাসকে গ্রেপ্তারের জন্য আমাদের বিশেষ টিম অভিযান পরিচালনা করছে।”

মানবাধিকার ও সামাজিক উদ্বেগের প্রতিফলন

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ঘটনাটি সমাজে ‘Domestic Violence’ এবং দত্তক নেওয়া শিশুদের সুরক্ষার বিষয়টি পুনরায় আলোচনায় নিয়ে এসেছে। উচ্চবিত্ত বা তথাকথিত শিক্ষিত পরিবারে এমন ‘Human Rights’ বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা উদ্বেগজনক। কিশোরী মিমকে বর্তমানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও মানসিক কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

Tags: police arrest sexual harassment crime news human rights child abuse domestic violence barisal news child recovery barisal police adopted child