• আন্তর্জাতিক
  • মধ্যপ্রাচ্যে নজিরবিহীন ফাটল: সৌদি আল্টিমেটামের মুখে ইয়েমেন থেকে সব সেনা সরাচ্ছে আরব আমিরাত

মধ্যপ্রাচ্যে নজিরবিহীন ফাটল: সৌদি আল্টিমেটামের মুখে ইয়েমেন থেকে সব সেনা সরাচ্ছে আরব আমিরাত

আন্তর্জাতিক ১ মিনিট পড়া
মধ্যপ্রাচ্যে নজিরবিহীন ফাটল: সৌদি আল্টিমেটামের মুখে ইয়েমেন থেকে সব সেনা সরাচ্ছে আরব আমিরাত

উপসাগরীয় দুই পরাশক্তির মধ্যে চরম উত্তেজনা; মুকাল্লা বন্দরে রিয়াদের বিমান হামলার পর ইয়েমেনে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক উপস্থিতির ইতি টানছে আবুধাবি।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে (Geopolitics) এক নাটকীয় মোড় নিয়ে ইয়েমেন থেকে তাদের অবশিষ্ট সমস্ত সৈন্য ও সামরিক সরঞ্জাম প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। দীর্ঘদিনের মিত্র সৌদি আরবের সাথে ক্রমবর্ধমান বিরোধ এবং রিয়াদের পক্ষ থেকে দেওয়া মাত্র ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটামের মুখে মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) আবুধাবি এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এর ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের দুই প্রধান তেল উৎপাদনকারী ও সামরিক শক্তির মধ্যেকার ফাটল এখন প্রকাশ্য রূপ নিল।

সৌদি আল্টিমেটাম ও মুকাল্লা বন্দরে হামলা

ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনী দক্ষিণ ইয়েমেনের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মুকাল্লা বন্দরে আকস্মিক বিমান হামলা চালায়। রিয়াদের দাবি, ওই বন্দরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি বড় ধরনের অস্ত্রের চালান (Arms Shipment) খালাস করা হচ্ছিল। এই হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সৌদি আরব সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাহিনীকে ইয়েমেন ত্যাগের জন্য মাত্র ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দেয়। গত কয়েক বছরের মধ্যে দুই দেশের এই ‘ছায়া যুদ্ধ’ বা প্রক্সি ওয়ারের এটিই সবচেয়ে বড় এবং সরাসরি সংঘাতের ঘটনা।

আবুধাবির ‘স্বেচ্ছায়’ মিশন সমাপ্তির ব্যাখ্যা

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইয়েমেনে তাদের সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিটের (Counter-terrorism Unit) মিশন তারা স্বেচ্ছায় শেষ করছে। ২০১৯ সালে দেশটি ইয়েমেন থেকে মূল বাহিনী প্রত্যাহার করলেও নির্দিষ্ট কিছু সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনার জন্য সীমিত সংখ্যক সেনা সেখানে রেখেছিল।

আমিরাতি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "বর্তমান পরিস্থিতি এবং সন্ত্রাসবিরোধী মিশনের নিরাপত্তা ও কার্যকারিতার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইয়েমেনে থাকা অবশিষ্ট দলগুলোকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।" যদিও রয়টার্সের প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, সৌদি চাপের মুখে নিজেদের বাহিনীর নিরাপত্তা ও সম্মান রক্ষার্থেই এই দ্রুত প্রত্যাহারের (Military Withdrawal) সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ওয়াশিংটনের উদ্বেগ ও কূটনৈতিক তৎপরতা

এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের এই দুই গুরুত্বপূর্ণ মিত্রের মধ্যে বিরোধ চরম আকার ধারণ করায় নড়েচড়ে বসেছে ওয়াশিংটন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর (US State Department) জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইতিমধ্যে সৌদি ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সাথে টেলিফোনে কথা বলেছেন। তিনি ইয়েমেনের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা নিরসন এবং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা (Regional Security) বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুই দেশকেই সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়েছে।

আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া ও মধ্যস্থতার চেষ্টা

উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে কুয়েত এবং বাহরাইন এই পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। দেশগুলো এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা যেকোনো ধরনের সংলাপ জোরদার এবং একটি রাজনৈতিক সমাধানে (Political Solution) পৌঁছানোর প্রচেষ্টাকে পূর্ণ সমর্থন করবে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদি-আমিরাত জোটে যে ফাটল ধরেছে, তা কেবল ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ নয়, বরং বৈশ্বিক তেলের বাজার এবং ইরানবিরোধী জোটেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

একটি দীর্ঘ যুদ্ধের পটভূমি

২০১৫ সাল থেকে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের দমনে ইয়েমেনে সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। সংযুক্ত আরব আমিরাত ছিল এই জোটের প্রধান অংশীদার। তবে ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে গত কয়েক বছর ধরেই রিয়াদ ও আবুধাবির মধ্যে মতভেদ তৈরি হচ্ছিল। মঙ্গলবারের এই ঘোষণা ইয়েমেনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সরাসরি সামরিক উপস্থিতির আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটাল, যা এই অঞ্চলের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক নতুন মেরুকরণের জন্ম দিচ্ছে।

Tags: middle east saudi arabia regional security geopolitics uae yemen military withdrawal yemen war arms shipment marco rubio gulf crisis