কূটনৈতিক শিষ্টাচার আর জাতীয় নিরাপত্তা যে এক সমান্তরালে চলে না, তা আরও একবার স্পষ্ট করে দিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। দিনকয়েক আগে ঢাকার মাটিতে পাকিস্তানের প্রতিনিধির সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করলেও, ঘরের মাঠে ফিরেই ইসলামাবাদকে ‘খারাপ প্রতিবেশী’ (Bad Neighbor) হিসেবে চিহ্নিত করে চরম হুঁশিয়ারি দিলেন তিনি। সাফ জানিয়ে দিলেন, সন্ত্রাসবাদ জারি রেখে জলবণ্টন বা বন্ধুত্বের সুবিধা পাওয়া সম্ভব নয়।
সৌজন্যের আড়ালে কঠোর অবস্থান
সম্প্রতি বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় গিয়েছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক। সেখানে দুই নেতার সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ, করমর্দন এবং কুশল বিনিময় আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। অনেকে একে ভারত-পাক সম্পর্কের বরফ গলার ইঙ্গিত হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। তবে সেই গুঞ্জনে জল ঢেলে জয়শঙ্কর স্পষ্ট করেছেন যে, ব্যক্তিগত শিষ্টাচার ভারতের National Security বা জাতীয় নিরাপত্তা নীতির ঊর্ধ্বে নয়।
মাদ্রাজ আইআইটিতে জয়শঙ্করের হুঙ্কার
মাদ্রাজের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (IIT Madras) শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে এক বক্তৃতায় জয়শঙ্কর সরাসরি পাকিস্তানের নাম না করে তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “আমাদের কী করা উচিত বা কী করা উচিত নয়, তা অন্য কেউ ঠিক করে দিতে পারে না।” মূলত ‘অপারেশন সিন্ধু’ বা সিন্ধু নদের জলবণ্টন সংক্রান্ত উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই মন্তব্য করেন তিনি।
জয়শঙ্কর বলেন, “দুর্ভাগ্যবশত আমাদের একজন খারাপ প্রতিবেশী আছে। যখন কোনো দেশ পরিকল্পিতভাবে এবং অনুশোচনাহীনভাবে সন্ত্রাসবাদ (Terrorism) চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন আমাদের জনগণকে রক্ষা করার পূর্ণ অধিকার আমাদের আছে। আমরা সেই অধিকার প্রয়োগ করবই।”
সন্ত্রাসবাদ ও সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তি (Indus Waters Treaty)
১৯৬০ সালে স্বাক্ষরিত সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে ভারতের অনমনীয় মনোভাবের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। পহেলগাম হামলার পর এই চুক্তি নিয়ে ভারতের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে। জয়শঙ্কর সাফ জানান, এক হাতে সন্ত্রাসবাদ আর অন্য হাতে বন্ধুত্বের সুবিধা—এই নীতি আর চলবে না।
তিনি বলেন, “বহু বছর আগে আমরা একটি পানি-বণ্টন ব্যবস্থায় একমত হয়েছিলাম। কিন্তু যদি দশকের পর দশক ধরে সন্ত্রাসবাদ জারি থাকে, তবে তাকে সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণ বলা যায় না। আপনি একদিকে আমার দেশে সন্ত্রাসবাদ চালাবেন, আর অন্যদিকে বলবেন—দয়া করে আমার সাথে পানি ভাগ করে নিন, এটা হতে পারে না।”
প্রতিবেশী নীতি ও ভারতের কৌশল
ভারত তার বিভিন্ন ধরনের প্রতিবেশীদের নিয়ে ‘আশীর্বাদপ্রাপ্ত’ মন্তব্য করে জয়শঙ্কর বলেন, যারা ভারতের ক্ষতি করে না বা ভারতের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ, তাদের প্রতি নয়াদিল্লির দৃষ্টিভঙ্গি সবসময়ই সদয়। কিন্তু পাকিস্তানের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। জয়শঙ্করের মতে, ভারতের অধিকাংশ সমস্যার মূলে রয়েছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জয়শঙ্করের এই মন্তব্য বৈশ্বিক Geopolitics-এ ভারতের এক শক্তিশালী বার্তা। একদিকে Diplomatic সৌজন্য বজায় রাখা, অন্যদিকে দেশের সীমানা ও নিরাপত্তার প্রশ্নে আপসহীন থাকা—এই দ্বিমুখী কৌশলেই এগোচ্ছে মোদী সরকার। জয়শঙ্করের এই কঠোর বার্তা ইসলামাবাদকে নতুন করে চাপে ফেলবে বলে মনে করছে কূটনৈতিক মহল।