অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় মানবিক বিপর্যয় চরমে পৌঁছালেও থামছে না ইসরাইলের কঠোর অবস্থান। এবার গাজায় জীবনরক্ষাকারী ত্রাণ ও চিকিৎসা সেবা প্রদানকারী ৩৭টি আন্তর্জাতিক সংস্থার (International Organizations) কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে নেতানিয়াহু সরকার। ইসরাইলি প্রশাসনের এই বিতর্কিত পদক্ষেপে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো।
মানবিক সেবায় রাজনৈতিক খড়্গ
ইসরাইলি সরকারের দাবি, এসব সংস্থা ফিলিস্তিনিদের সহায়তার আড়ালে সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছে। তবে এই অভিযোগের সপক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেশ করতে পারেনি তেল আবিব। নিষিদ্ধ ঘোষিত সংস্থাগুলোর তালিকায় বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা ‘ডক্টর্স উইদাউট বর্ডারস’ (MSF)-এর নামও রয়েছে, যারা যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় ফ্রন্টলাইন মেডিকেল সার্ভিস দিয়ে আসছিল।
এই নিষেধাজ্ঞার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে খোদ ইসরাইলের ১৯টি শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংগঠন। 'আদালাহ'-সহ এই সংগঠনগুলো এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, গাজায় মানবিক সহায়তা বা Humanitarian Aid বন্ধের এই সিদ্ধান্ত চরম অমানবিক এবং এটি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। তারা অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে।
কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতি, বাস্তবে আগ্রাসন
গাজায় তথাকথিত যুদ্ধবিরতি (Ceasefire) চললেও মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। বৃহস্পতিবার সকালেও নাবলুস শহরের কাছে অতর্কিত হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। এছাড়া দক্ষিণ গাজার রাফাহ সীমান্তে হেলিকপ্টার ও সামরিক যান থেকে বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ করা হয়েছে। ইসরাইলি বাহিনীর ভারী গোলাবর্ষণে গাজা সিটির পূর্বাঞ্চল, খান ইউনিস এবং বুরেইজ শরণার্থী শিবিরে নতুন করে ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন ফুটে উঠেছে। উত্তর গাজার জাবালিয়া ক্যাম্পটিও বর্তমানে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত এই অঞ্চলে এখন নতুন আতঙ্ক হিসেবে দেখা দিয়েছে হাড়কাঁপানো শীত। পর্যাপ্ত খাবার ও আশ্রয়ের অভাবে তীব্র ঠান্ডায় ইতোমধ্যেই একাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলেছেন, পর্যাপ্ত ওষুধ ও জ্বালানি সরবরাহ না থাকলে এই মৃত্যুমিছিল আরও দীর্ঘ হবে।
পশ্চিম তীরে অস্থিরতা ও আল-আকসায় অনুপ্রবেশ
অধিকৃত পশ্চিম তীরেও ইসরাইলি বাহিনী এবং অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের (Settlers) তাণ্ডব অব্যাহত রয়েছে। বেথলেহেমে তল্লাশি অভিযানের নামে স্থানীয়দের ওপর চড়াও হয়েছে ইসরাইলি সেনারা। অন্যদিকে হেবরনে ফিলিস্তিনিদের কৃষি স্থাপনা ধ্বংস ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ইসরাইলি সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতেই এসব হামলা চালানো হচ্ছে।
এদিকে পবিত্র আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণেও চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তত দুই শতাধিক ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে আল-আকসা প্রাঙ্গণে অনুপ্রবেশ করেছে, যা ওই অঞ্চলের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে চরম হুমকির মুখে ফেলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলোকে (NGOs) নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে গাজাকে একটি জনমানবহীন ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।