খুলনা জেলার ডুমুরিয়ায় এক বিশাল কর্মী ও সদস্য সমাবেশে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ছাত্র-জনতার দীর্ঘ সংগ্রামের পর অর্জিত এই পরিবর্তনকে নস্যাৎ করার কোনো অপচেষ্টাই সফল হতে দেওয়া হবে না। শুক্রবার (২ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় ডুমুরিয়া উপজেলার লাইন বিল পাবলা পূজা মন্দিরে হিন্দু ধর্মালম্বীদের এক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
‘সাজানো নির্বাচনের দিন শেষ’
২০২৬ সালের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট যখন উত্তপ্ত, ঠিক তখনই মিয়া গোলাম পরওয়ারের এই বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। বিগত এক দশকের নির্বাচনী অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “২০১৪, ২০১৮ কিংবা ২০২৪ সালের মতো কোনো প্রহসনের বা সাজানো নির্বাচন এই দেশের সচেতন নাগরিক আর মেনে নেবে না। যারা আবারও জনগণের ভোটাধিকার হরণ করতে চাইবে, তাদের জন্য এটি একটি পরিষ্কার সতর্কতা—এই জাতি অতীতের মতো ভবিষ্যতেও কাউকে ছাড় দেবে না।”
তিনি আরও যোগ করেন, “জনগণ রক্ত দিয়ে দেশে যে পরিবর্তন এনেছে, সেই পরিবর্তনের সুফল প্রতিটি মানুষের ঘরে পৌঁছে দিতে আমরা বদ্ধপরিকর। প্রয়োজনে আরও রক্ত দিয়ে হলেও এই রাজনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরকে আমরা সফল করব।”
ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন লড়াই
জামায়াতের এই শীর্ষ নেতা তার বক্তব্যে ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি রোধে কঠোর অবস্থানের কথা জানান। তিনি বলেন, “আমাদের লড়াই কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, বরং দীর্ঘদিনের চেপে বসা ফ্যাসিবাদ এবং জনজীবন অতিষ্ঠ করা চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে। এই ‘Tech-savvy’ যুগে আধুনিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে হলে আগে সমাজকে দখলবাজমুক্ত করতে হবে। ফ্যাসিবাদ পুরোনো হোক বা নতুন—যতদিন এর অস্তিত্ব থাকবে, জামায়াতে ইসলামীর সংগ্রাম ততদিন অব্যাহত থাকবে।”
অসাম্প্রদায়িক ও নিরাপদ বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি
হিন্দু সম্প্রদায়ের সমাবেশে মিয়া গোলাম পরওয়ার ইসলামের প্রকৃত চেতনার কথা তুলে ধরে বলেন, “ইসলামই একমাত্র জীবনব্যবস্থা যা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে। আমরা এমন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি যেখানে কেউ সংখ্যালঘুবোধ করবে না। আমরা যদি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাই, তবে একটি প্রকৃত ‘ইসলামিক কল্যাণ রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা করব, যেখানে সবার জন্য সমান বিচার বা ‘Social Justice’ নিশ্চিত হবে।”
তিনি তরুণ প্রজন্মের জন্য এমন একটি দেশ রেখে যাওয়ার অঙ্গীকার করেন, যেখানে কর্মসংস্থান বা ‘Job Creation’ হবে মেধার ভিত্তিতে এবং বাজার ব্যবস্থার ওপর রাজনৈতিক প্রভাব থাকবে না, ফলে নিত্যপণ্যের ‘Market Value’ সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকবে।
বিল ডাকাতিয়ার জলাবদ্ধতা ও আঞ্চলিক উন্নয়ন
স্থানীয় জনগণের দীর্ঘদিনের দাবি প্রসঙ্গে গোলাম পরওয়ার বলেন, বিল ডাকাতিয়া এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন তার অন্যতম অগ্রাধিকার। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, অতীতেও খাল খনন ও নদী ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলে এই সমস্যার একটি টেকসই এবং বৈজ্ঞানিক সমাধান নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি, যা স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।
সমাবেশের সারসংক্ষেপ
হিন্দু কমিটির সদস্য কুমারেশ কুমার মণ্ডলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খুলনা জেলা সেক্রেটারি মুন্সি মিজানুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি অধ্যাপক মিয়া গোলাম কুদ্দুস এবং জেলা কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবু ইউসুফ মোল্লা। বক্তারা আগামী নির্বাচনে ইনসাফ ও ন্যায়ের প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’কে বিজয়ী করার জন্য উপস্থিত সবার প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।
এর আগে বিকেলে ডুমুরিয়ার গুটুদিয়া ইউনিয়নের খামারবাড়ী এলাকায় অন্য একটি সমাবেশেও একই সংকল্প পুনর্ব্যক্ত করেন জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল।