সমতলের প্রথম প্রযোজনা ও একক অভিনয়
নাট্যদল 'সমতল'-এর প্রথম প্রযোজনা হিসেবে আজ ৩ জানুয়ারি সন্ধ্যা ৬টায় বাংলাদেশ মহিলা সমিতি মিলনায়তনে 'লুৎফার প্রদীপ' নাটকের উদ্বোধনী প্রদর্শনী হবে। একই দিনে রাত ৮টা ৫ মিনিটে দ্বিতীয় প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে। এই নাটকের মাধ্যমেই জনপ্রিয় অভিনেত্রী চিত্রলেখা গুহ প্রথমবারের মতো মঞ্চে একক চরিত্রে অভিনয় করছেন, যা নিঃসন্দেহে তাঁর অভিনয়-জীবনে এক বিশেষ অর্জন। প্রায় চার বছর পর তিনি নতুন কোনো মঞ্চনাটকের সঙ্গে যুক্ত হলেন।
নাটকের মূল উপজীব্য
'লুৎফার প্রদীপ' নাটকের গল্প আবর্তিত হয়েছে পলাশীর যুদ্ধ-পরবর্তী এক গভীর করুণ ইতিহাসকে কেন্দ্র করে। ১৭৫৭ সালের যুদ্ধে পরাজয়ের পর নির্মমভাবে নিহত হন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা। তাঁর মরদেহ ভাগীরথী নদীর অন্য পাড়ে খোশবাগে নবাব আলীবর্দী খানের কবরের পাশে সমাহিত করা হয়। সিরাজের স্ত্রী লুৎফুন্নেসা, যিনি ইতিহাসে 'লুৎফা' নামে পরিচিত, স্বামীর প্রতি গভীর প্রেম ও ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ প্রতিদিন সন্ধ্যায় তাঁর কবরে একটি প্রদীপ জ্বালিয়ে আসতেন। নিজের মৃত্যু পর্যন্ত তিনি এই প্রদীপ জ্বালানোর ধারা বজায় রাখেন। এই প্রদীপের তাৎপর্য কেবল ব্যক্তিগত শোক ও ভালোবাসার প্রকাশ, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর কোনো অর্থ—সেই প্রশ্নই নাটকের কেন্দ্রীয় ভাবনা।
নাট্যকার ও নির্দেশকের ভাবনা
নাট্যকার তানভীর মোকাম্মেল বলেন, সিরাজের কবরে প্রজ্বলিত এই প্রদীপটি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত শোকের প্রতীক নয়। এটি হয়ে ওঠে এই ভূখণ্ডের স্বাধীনতার আশা-আকাঙ্ক্ষাকে বাঁচিয়ে রাখার এক প্রতীকী চিহ্ন। তাঁর মতে, বাংলার ইতিহাসে বারবার বিদেশি শক্তি দেশি দালালদের সহায়তায় ক্ষমতা ও সম্পদ দখল করেছে এবং ভালো শাসকদের টিকে থাকতে দেওয়া হয়নি। এই পরাধীনতার আবহের মধ্যে লুৎফার প্রদীপ একটি জাতির স্বপ্ন ও প্রত্যাশার প্রতিচ্ছবি হিসেবে কাজ করে।
অন্যদিকে, নির্দেশক সগীর মোস্তফা জানান, ইতিহাস সাধারণত বিজয়ীদের কথাই তুলে ধরে, কিন্তু বিজিতদের বেদনা, ত্যাগ ও দীর্ঘশ্বাস অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়। 'লুৎফার প্রদীপ' কেবল সিরাজের পরাজয়ের কাহিনি নয়; এটি সিরাজ-পত্নী লুৎফুন্নেসার অসীম প্রেম, ধৈর্য এবং আজীবন বয়ে বেড়ানো শোকের এক জীবন্ত উপাখ্যান।
চিত্রলেখা গুহের অনুভূতি ও কলাকুশলী
একক অভিনয় প্রসঙ্গে অভিনেত্রী চিত্রলেখা গুহ তাঁর বিশেষ আনন্দের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, 'লুৎফার প্রদীপ সমতলের প্রথম প্রযোজনা—এটাই আমার জন্য বিশেষ আনন্দের। গল্পটি অসাধারণ। নির্দেশকের নির্দেশনা অনুযায়ী নিজেকে প্রস্তুত করার চেষ্টা করেছি। অভিনয়জীবনে এই প্রথম মঞ্চে একক অভিনয় করছি, অনুভূতিটা একেবারেই ভিন্ন।' তিনি দর্শকদের নাটকটি দেখার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
নাটকটির শিল্প নির্দেশনা ও আলোক পরিকল্পনায় রয়েছেন উত্তম গুহ। আবহসংগীত ও শব্দ পরিকল্পনায় আছেন সৈয়দ সাবাব আলী আরজু এবং পোশাক পরিকল্পনা করেছেন ওয়াহিদা মল্লিক জলি। ইতিহাস, প্রেম ও স্বাধীনতার প্রতীকে গাঁথা এই নাটকটি দর্শকদের একটি ভিন্নধর্মী মঞ্চ অভিজ্ঞতা দেবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেছেন।