বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইতিহাসের গতিপ্রকৃতি এবং জাতীয় স্মৃতি মুছে ফেলার ক্রমবর্ধমান প্রবণতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী ও সমাজকর্মী আনুশেহ আনাদিল। তার মতে, একটি গোষ্ঠীর মধ্যে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে বাংলাদেশের নৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।
জুলাই অভ্যুত্থান বনাম একাত্তর আনুশেহ আনাদিল মনে করেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদ, দুর্নীতি ও অপশাসনের বিরুদ্ধে একটি ন্যায্য ও প্রয়োজনীয় বিদ্রোহ। তবে এই অভ্যুত্থানকে কোনোভাবেই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বিকল্প বা 'সংশোধন' হিসেবে দেখা উচিত নয়। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান একাত্তরের চেতনার পরিপূরক হতে পারে, কিন্তু একে প্রতিস্থাপন করা ইতিহাসের প্রতি অসততা।
একাত্তর কোনো দলীয় একচেটিয়া বিষয় নয় মুক্তিযুদ্ধকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের (আওয়ামী লীগ) সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করার যে প্রবণতা ছিল, সেটিকে একটি 'বিকৃতি' হিসেবে অভিহিত করেছেন আনুশেহ। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে সাধারণ মানুষ লড়েছিল মর্যাদা ও ভাষার অধিকার রক্ষার জন্য। কোনো দল যদি পরে সেই অর্জনকে কুক্ষিগত করে, তার দায় ইতিহাসের নয়। একাত্তরকে মুছে ফেলা মানে বাংলাদেশের জন্মের কারণকেই অস্বীকার করা, যা দেশকে একটি 'শিকড়হীন' জাতিতে পরিণত করতে পারে।
ডানপন্থি রাজনীতির উত্থান ও স্মৃতিভ্রম সাম্প্রতিক সময়ে দেশে একটি বিপজ্জনক ডানপন্থি ঝোঁক লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলে দাবি করেন এই শিল্পী। তিনি ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের উদাহরণ টেনে একে একটি বৈশ্বিক প্যাটার্নের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, এ ধরনের উত্তেজনামূলক ঘটনা জনমনস্তত্ত্বকে সুকৌশলে ডান দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং কাঠামোগত ব্যর্থতা থেকে মানুষের নজর সরিয়ে দিচ্ছে।
সার্বভৌমত্ব ও ঐতিহাসিক স্বচ্ছতা ভারত বা অন্য কোনো রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতার অজুহাতে একাত্তরকে মুছে ফেলা কোনোভাবেই সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে না; বরং এটি কেবল একটি জাতীয় স্মৃতিভ্রম সৃষ্টি করে। আনুশেহ আনাদিল জোর দিয়ে বলেন, একাত্তর ছাড়া মুক্ত করা বা সংস্কার করার মতো কোনো বাংলাদেশই অবশিষ্ট থাকে না। জাতিকে সামনে এগিয়ে নিতে হলে ইতিহাসের বিকৃতি নয়, বরং ঐতিহাসিক স্বচ্ছতা প্রয়োজন। যে রাজনীতি শেকড় ভুলিয়ে দিতে চায়, তা কখনো বৈপ্লবিক হতে পারে না।