লাশ উদ্ধার ও নিহতদের পরিচয় সোমবার (০৫ জানুয়ারি) সকাল ৮টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের একটি দল সাইফুল ইসলাম ও আবদুল খালেক নামের দুই শ্রমিকের লাশ উদ্ধার করে। নিহতদের বাড়ি গাইবান্ধা জেলায়। এদের মধ্যে সাইফুলের লাশটি খণ্ডবিখণ্ড অবস্থায় পাওয়া যায়। তারা দুজনেই স্থানীয় 'কেআর শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে' কাজ করতেন।
মৃত্যুর কারণ নিয়ে দ্বিমত: ডাকাত হামলা বনাম দুর্ঘটনা এই দুই শ্রমিকের মৃত্যুর কারণ নিয়ে ফায়ার সার্ভিস এবং শিল্প পুলিশ ও অন্যান্যদের মধ্যে স্পষ্ট মতভেদ রয়েছে।
-
ফায়ার সার্ভিসের দাবি: ডাকাতদের হামলা ফায়ার সার্ভিসের কুমিরা স্টেশনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আল মামুন জানান, কারখানা কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, রাতে শ্রমিকরা একটি ছোট নৌকায় করে উপকূলীয় এলাকা পাহারা দিচ্ছিলেন। এ সময় ডাকাতদল মালামাল লুটের চেষ্টা করলে শ্রমিকরা বাধা দেন। তখন ডাকাতদের হামলায় এক শ্রমিক গুরুতর আহত হন এবং বাকিরা নৌকা থেকে সাগরে পড়ে যান। এতে দুজনের মৃত্যু হয় এবং আরও দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়। কেআর শিপ মেকিং ইয়ার্ডের ম্যানেজার আবু সাজ্জাদ মুন্নাও একই কথা বলেন— রোববার দুপুরে একটি স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটিংয়ের জন্য আনা হয়েছিল, রাতে ২০-২৫ জনের একটি ডাকাতদল অস্ত্র নিয়ে নৈশ প্রহরীর ওপর হামলা চালায়।
-
শিল্প পুলিশ ও শ্রমিক সংগঠনের দাবি: জাহাজ বিচিং দুর্ঘটনা অন্যদিকে, শিল্প পুলিশের পরিদর্শক নাহিদ হাসান মৃধা জানান, প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, নতুন জাহাজ বিচিং (জাহাজ তীরে ভিড়ানোর প্রক্রিয়া) করার সময় একটি দুর্ঘটনার মাধ্যমে এ ঘটনা ঘটে। জাহাজ তোলার সময় নৌকাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এতে দুই শ্রমিকের মৃত্যু হয়।
পুলিশের বক্তব্য ও তদন্তের অগ্রগতি সীতাকুণ্ড থানার ওসি তদন্ত মোহাম্মদ আলমগীর জানান, এই ঘটনায় এখনো কোনো কিছু স্পষ্ট নয়। উদ্ধার করা একটি মরদেহ এবং অন্যটির অংশবিশেষ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেলে মৃত্যুর আসল কারণ জানা যাবে।
জাহাজভাঙা শিল্পের পুরোনো চিত্র বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)-এর বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অঞ্চলের জাহাজভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনার হার উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালে সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা ইয়ার্ডগুলোতে মোট ৪৮টি দুর্ঘটনায় ৫৮ জন শ্রমিক আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং চারজন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এই দুর্ঘটনার প্রায় ৬৩ শতাংশ ছিল মারাত্মক প্রকৃতির, যাতে শ্রমিকদের অঙ্গহানি, হাড় ভাঙা, আগুন ও বিস্ফোরণে দগ্ধ হওয়ার মতো ভয়াবহ পরিণতি ঘটেছে।
দুর্ঘটনার কারণ বিশ্লেষণ বিলসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিনের বেলায় ঘটে যাওয়া ২৯টি দুর্ঘটনার (মোটের ৬০ শতাংশ) প্রধান কারণ ছিল ভারী লোহার কাজ, কাটিং ও লোডিং কার্যক্রম। অন্যদিকে রাতের বেলায় হওয়া ১৯টি দুর্ঘটনার (মোটের ৪০ শতাংশ) পেছনে আলোর স্বল্পতা, অতিরিক্ত ক্লান্তি এবং পর্যাপ্ত তদারকির অভাবকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দুর্ঘটনার ধরনে সবচেয়ে বেশি (৩৫ শতাংশ) ছিল ভারী লোহা বা গার্ডার পড়ে আঘাত পাওয়ার ঘটনা।