দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন দ্বাদশ নির্বাচন পরবর্তী সংস্কার ও নতুন ভোটাধিকার প্রয়োগের আবহ তৈরি হচ্ছে, ঠিক তখনই ‘পাতানো নির্বাচনের’ এক গুরুতর অভিযোগ তুলল জাতীয় নাগরিক পার্টি (NCP)। মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (CEC) এএমএম নাসির উদ্দীনের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, পর্দার আড়ালে কোনো ‘Settlement’ করার চেষ্টা হলে তা ভোটের দিন পর্যন্ত গড়াতে দেওয়া হবে না; বরং তার আগেই রাজপথে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্ব ও অশনিসংকেত
নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনার মূল বিষয়বস্তু তুলে ধরে আসিফ মাহমুদ বলেন, বর্তমান প্রশাসনের একটি বড় অংশের মধ্যে নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক দলের প্রতি স্পষ্ট পক্ষপাতিত্ব পরিলক্ষিত হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, জনরায় বা Public Mandate প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই প্রজাতন্ত্রের শীর্ষ কর্মকর্তাদের একটি দলের চেয়ারপারসনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে যাওয়া বাংলাদেশের Democracy বা গণতন্ত্রের জন্য এক চরম ‘অশনিসংকেত’।
আসিফ মাহমুদের মতে, আমলাতন্ত্র বা Bureaucracy যদি নিরপেক্ষ অবস্থানে না থাকে, তবে কোনোভাবেই একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, প্রশাসনের এই ধরনের আচরণ কি আবারও কোনো ‘পুরনো সেটেলমেন্ট’ বা পূর্বনির্ধারিত ফলাফলের দিকে ইঙ্গিত করছে?
এনএসআই প্রধানের ভূমিকা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপি মুখপাত্র অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স (NSI) প্রধানের একটি বিশেষ দলের রাজনৈতিক কার্যালয়ে গিয়ে বৈঠক করার ঘটনার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, গোয়েন্দা সংস্থা বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি নির্বাচনের Level Playing Field-কে ধ্বংস করে দিচ্ছে।
ভোটের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি আরও যোগ করেন, “চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের জেলের বাইরে রেখে কোনোভাবেই সুষ্ঠু নির্বাচন (Fair Election) আয়োজন করা সম্ভব নয়। এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই আস্থা জাগানিয়া পরিবেশ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে।”
ইসি-র নিরপেক্ষতা ও মনোনয়ন নাটক
নির্বাচন কমিশনের (EC) বর্তমান ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করে আসিফ মাহমুদ জানান, জাতীয় নাগরিক পার্টি বর্তমান কমিশনের ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছে না। বিশেষ করে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই বা Nomination Scrutiny প্রক্রিয়ায় রিটার্নিং অফিসাররা বড় দলগুলোর প্রতি নমনীয়তা দেখাচ্ছেন বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “আপিলের ক্ষেত্রেও যদি ইসি তার পূর্ণ Neutrality বা নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে না পারে, তবে এই কমিশনের সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আদৌ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে কি না, তা নিয়ে আমরা শঙ্কিত।”
জাতীয় পার্টি নিয়ে অবস্থান
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া রাজনৈতিক মিত্র ও প্রতিপক্ষদের স্পষ্ট বার্তা দেন। বিশেষ করে জাতীয় পার্টি যাতে কোনোভাবেই আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে, সে বিষয়ে সরকারকে সতর্ক করেন তিনি। এনসিপির অবস্থান পরিষ্কার করে তিনি জানান, যারা বিগত স্বৈরাচারী ব্যবস্থার সহযোগী ছিল, তাদের ভোটের ময়দানে পুনর্বাসনের কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসিফ মাহমুদের এই কড়া হুঁশিয়ারি নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ সৃষ্টির পাশাপাশি রাজপথের আন্দোলনকে চাঙা করার একটি কৌশল হতে পারে। এখন দেখার বিষয়, নির্বাচন কমিশন এই অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে কোনো সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে কি না।