দুই দশকেরও বেশি সময়ের প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। দীর্ঘ ২৩ বছর পর উত্তরের সীমান্তঘেঁষা জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে পা রাখতে যাচ্ছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জ্যেষ্ঠ পুত্রের এই সফরকে কেন্দ্র করে জেলাজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক আবহ। জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো চার শহিদ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে আয়োজিত স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিলে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেবেন তিনি।
ঐতিহাসিক সফরের নির্ঘণ্ট ও কর্মসূচি
জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতাদের দেওয়া তথ্যমতে, আগামী ১২ জানুয়ারি রাতে তারেক রহমান সড়কপথে (By Road) ঠাকুরগাঁওয়ে পৌঁছাবেন। তার এই সফরকে ঘিরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে বিএনপি এবং এর সকল অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন।
সফরের সূচি অনুযায়ী:
১২ জানুয়ারি: রাতে ঠাকুরগাঁওয়ে পৌঁছে তিনি শহরের ‘বুরো বাংলাদেশ’ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে রাত্রিযাপন করবেন।
১৩ জানুয়ারি (মঙ্গলবার): সকাল ১০টায় তিনি জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের শহিদ আল মামুনের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও জিয়ারত করবেন।
স্মরণসভা: বেলা ১১টায় ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে (বড় মাঠ) আয়োজিত দোয়া মাহফিল ও স্মরণসভায় প্রধান অতিথির ভাষণ দেবেন।
পরবর্তী গন্তব্য: ঠাকুরগাঁওয়ের কর্মসূচি শেষে তিনি পার্শ্ববর্তী জেলা পঞ্চগড়ের উদ্দেশে রওনা হবেন।
তৃণমূলের আবেগ ও রাজনৈতিক সমীকরণ
তারেক রহমানের এই আগমনকে কেবল একটি রাজনৈতিক সফর হিসেবে দেখছেন না দলটির নেতাকর্মীরা; বরং একে দেখছেন ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের’ নতুন প্রেরণা হিসেবে। ২০০৩ সালে সর্বশেষ শীতবস্ত্র বিতরণের কর্মসূচিতে তিনি এই জেলায় এসেছিলেন। এরপর দীর্ঘ ২৩ বছরের বিরতি শেষে তার ফিরে আসাকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের ‘Grassroots Connectivity’ আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
জেলা মহিলা দলের সভানেত্রী ফোরাতুন নাহার প্যারিস বলেন, “তারেক রহমান আমাদের কাছে সাহসের প্রতীক। দীর্ঘ সময় পর তাঁর সরাসরি উপস্থিতি ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করবে।” অন্যদিকে, জেলা ছাত্রদলের সভাপতি মো. কায়েস মনে করেন, জুলাই-আগস্টের বিপ্লবে যারা আত্মত্যাগ করেছেন, তাঁদের রক্তের ঋণ স্বীকার করে শহিদ পরিবারের পাশে দাঁড়ানো তারেক রহমানের এই সফর নৈতিকভাবে নেতাকর্মীদের আরও ঐক্যবদ্ধ করবে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক তৎপরতা
তারেক রহমানের সফরের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ‘Security Protocol’ অত্যন্ত কঠোর করা হয়েছে। জেলা বিএনপির সভাপতি ফয়সল আমিন ও সাধারণ সম্পাদক মো. পয়গাম আলী জানিয়েছেন, তারা একাধিক প্রস্তুতি সভা করেছেন এবং প্রশাসনের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করছেন। যদিও নির্বাচনী আচরণবিধির কারণে এটি বড় জনসভা হিসেবে আয়োজিত হচ্ছে না, তবে স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিলের মাধ্যমেই বিশাল জনসমাগম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. বেলাল হোসেন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, “বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের আগমনকে কেন্দ্র করে জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে (High Alert) রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হবে। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই যেন কর্মসূচি সফল হয়, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক উইং কাজ করছে।”
নির্বাচনী আবহে এক নতুন বার্তা
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তারেক রহমানের এই জেলাভিত্তিক সফরগুলো আগামী নির্বাচনের আগে দলের ‘Mass Mobilization’ বা জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর একটি কৌশল (Strategy)। ২৩ বছর আগে যে ঠাকুরগাঁওয়ে তিনি এসেছিলেন একজন তরুণ নেতা হিসেবে, আজ তিনি সেখানে ফিরছেন দলের প্রধান কাণ্ডারি হয়ে। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে এই সফর বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনের এক বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।