কারাকাস ও ওয়াশিংটন: দক্ষিণ আমেরিকার তেলসমৃদ্ধ দেশ ভেনেজুয়েলার রাজনীতিতে বইছে পরিবর্তনের প্রবল হাওয়া। দীর্ঘদিনের শাসক নিকোলাস মাদুরোর নাটকীয় পতনের পর এবার নির্বাসন ভেঙে বীরের বেশে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন ভেনেজুয়েলার প্রধান বিরোধীদলীয় নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদো। একইসঙ্গে দেশে স্থিতিশীলতা ফেরাতে এবং জনগণের ম্যান্ডেট নিশ্চিত করতে দ্রুত একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের (Free and Fair Election) দাবি জানিয়েছেন তিনি। তবে নির্বাচনের সময়সীমা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য দেশটিতে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
নির্বাসন ভেঙে ফেরার অঙ্গীকার
৫৮ বছর বয়সী মারিয়া করিনা মাচাদো বর্তমানে কোথায় অবস্থান করছেন, তা নিরাপত্তার স্বার্থে গোপন রাখা হলেও ফক্স নিউজের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘হ্যানিটি’-তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। মাচাদো বলেন, "আমি যত দ্রুত সম্ভব ভেনেজুয়েলায় ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছি। আমাদের লড়াই এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে।" উল্লেখ্য, গত অক্টোবরে মাদুরো সরকারের দমন-পীড়নের মুখে ছদ্মবেশে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। সম্প্রতি তাকে 'নোবেল শান্তি পুরস্কার' (Nobel Peace Prize)-এ ভূষিত করা হয়েছে, যা তিনি উৎসর্গ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পকে।
ট্রাম্পের প্রশংসা ও নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ
মার্কিন কমান্ডোদের হাতে কারাকাসে মাদুরো ধরা পড়ার পর এটিই মাচাদোর প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া। মাদুরোকে উৎখাত করায় তিনি ট্রাম্পের নেতৃত্বের প্রশংসা করেন এবং তাকে ব্যক্তিগতভাবে নোবেল মেডেল প্রদানের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। মাচাদোর দাবি, ভেনেজুয়েলার ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ তার আন্দোলনের পক্ষে এবং একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিরোধীরা বিপুল ব্যবধানে জয়ী হবে।
তবে ওয়াশিংটনের সুর কিছুটা ভিন্ন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার বর্তমান পরিস্থিতি এখনও ভোট দেওয়ার মতো অনুকূল নয়। বিরোধীদের পক্ষ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে নির্বাচনের দাবি জানানো হলেও ট্রাম্প একে ‘অবাস্তব’ (Unrealistic) বলে অভিহিত করেছেন। ট্রাম্পের মতে, "আগে ভেনেজুয়েলাকে স্থিতিশীল করতে হবে। সেখানকার মানুষ এখন ভোট দেওয়ার মানসিক বা সামাজিক অবস্থায় নেই।"
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও বিরোধীদের উদ্বেগ
ভেনেজুয়েলার বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বেশ জটিল। ট্রাম্প প্রশাসন আপাতত অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট (Interim President) ডেলসি রদ্রিগেজ এবং মাদুরো আমলের কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে কাজ করার ইঙ্গিত দিয়েছে। এই বিষয়টি মাচাদো পন্থী ও সাধারণ বিক্ষোভকারীদের হতাশ করেছে। তারা মনে করছেন, মাদুরো না থাকলেও তার ‘সমাজতান্ত্রিক দলের’ অনুগতরা এখনও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ স্তরে এবং সামরিক বাহিনীতে প্রভাব বজায় রেখেছেন। এমনকি মাচাদোর বিরুদ্ধে ‘সামরিক বিদ্রোহে প্ররোচনা’ দেওয়ার অভিযোগে চলা তদন্তগুলোও এখনও প্রত্যাহার করা হয়নি।
গণতন্ত্রের পথে অন্তহীন বাধা
২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে মাচাদোকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বাধা দেওয়া হয়েছিল। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং মার্কিন মিত্রদের দাবি ছিল, সেই নির্বাচনে মাচাদোর মনোনীত প্রার্থীর জয় ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল কারচুপির মাধ্যমে। এখন মাদুরোর পতনের পর ক্ষমতা হস্তান্তরের এই ক্রান্তিকালে (Transition Period) মাচাদোর ফিরে আসা এবং দ্রুত নির্বাচনের দাবি ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, হোয়াইট হাউসের সাথে মাচাদোর সম্পর্কের রসায়ন এবং ভেনেজুয়েলার সামরিক বাহিনীর অবস্থানই ঠিক করে দেবে দেশটিতে প্রকৃত গণতন্ত্র ফিরবে কি না। মাদুরোর পতনের পর ভেনেজুয়েলা কি প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ পাবে, নাকি ক্ষমতার লড়াইয়ে আবারও দীর্ঘসূত্রতায় পড়বে দেশটি—এখন সেটাই দেখার বিষয়।