বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে লিওনেল মেসি একটি মহাকাব্যিক নাম। ক্লাব থেকে জাতীয় দল—সম্ভাব্য সব ট্রফিই তাঁর শোকেসে বন্দি। কিন্তু এই সাফল্যের শিখরে পৌঁছানোর পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না। একসময় শারীরিক প্রতিকূলতা ও আর্থিক টানাপোড়েনে থমকে যেতে বসেছিল এই বিস্ময় বালকের ক্যারিয়ার। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে মেসি তাঁর শৈশবের সেই কঠিন দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করেছেন, যেখানে উঠে এসেছে তাঁর প্রথম ক্লাব 'নিউয়েলস ওল্ড বয়েজ'-এর প্রশাসনিক অবহেলার কথা এবং সেই কারণে তাঁর মা সেলিয়া কুচিত্তিনির তীব্র ক্ষোভের প্রসঙ্গ।
অসুস্থতা ও গ্রোথ হরমোনের লড়াই
মেসির ফুটবল যাত্রা শুরু হয়েছিল রোসারিওর স্থানীয় ক্লাব 'আবান্দেরাদো গ্রানদোলি'তে। মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি যোগ দেন 'নিউয়েলস ওল্ড বয়েজ'-এ। কিন্তু ১১ বছর বয়সে তাঁর শরীরে ধরা পড়ে 'গ্রোথ হরমোন ডেফিসিয়েন্সি' (Growth Hormone Deficiency)। এই শারীরিক সমস্যার কারণে তাঁর স্বাভাবিক বৃদ্ধি থমকে গিয়েছিল। সেই সময় এই রোগের চিকিৎসা ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। মেসির বাবা হোর্হের কোম্পানির ইন্স্যুরেন্স খরচের একটা অংশ বহন করলেও বাকিটা ছিল সাধারণ পরিবারের সাধ্যের বাইরে।
মায়ের ক্ষোভ ও ক্লাবের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ
নিউয়েলস কর্তৃপক্ষ শুরুতে মেসির চিকিৎসার (Treatment Cost) দায়িত্ব নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তারা তা করেনি। মেসি সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করে বলেন, "আমরা শহরের দক্ষিণ অংশে থাকতাম। ক্লাব কর্তৃপক্ষ আমার মাকে চিকিৎসার টাকা নিতে আসার জন্য বারবার ডাকত, কিন্তু শেষ পর্যন্ত খালি হাতে ফিরিয়ে দিত।" কর্মকর্তাদের এই ধরণের টালবাহানা ও অসহযোগিতার কারণে মেসির মা সেলিয়া তৎকালীন কর্মকর্তাদের ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ ছিলেন। তবে মেসি স্পষ্ট করেছেন যে, এই রাগ ক্লাবের প্রতি নয় বরং সেই সময় দায়িত্বে থাকা নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি ছিল।
রিভার প্লেটের প্রস্তাব ও নিউয়েলসের বাধা
চিকিৎসা ও ক্যারিয়ারের প্রয়োজনে মেসি এরপর ট্রায়াল দিতে যান আর্জেন্টিনার অন্যতম শীর্ষ ক্লাব রিভার প্লেটে। সেখানে তিনি নিজের চেয়ে দুই বছর বড় ফুটবলারদের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে নির্বাচকদের নজরে পড়েন। রিভার প্লেট তাঁর চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে রাজি হয়েছিল এবং তাঁকে বোর্ডিংয়ে রাখার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু সেখানে যুক্ত হওয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল নিউয়েলস থেকে 'ট্রান্সফার পেপারস' (Transfer Papers)। নিউয়েলস ওল্ড বয়েজ সেই ছাড়পত্র দিতে অস্বীকৃতি জানায়, ফলে আটকে যায় মেসির রিভার প্লেটে যাওয়ার স্বপ্ন।
বার্সেলোনা ও ইতিহাসের নতুন মোড়
সব যখন শেষ হতে বসেছিল, তখনই আশার আলো হয়ে ধরা দেয় কাতালান জায়ান্ট বার্সেলোনা। ২০০০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ১৩ বছর বয়সী কিশোর মেসিকে ট্রায়ালের (Trial) জন্য স্পেনে নিয়ে যাওয়া হয়। বার্সেলোনার তৎকালীন টেকনিক্যাল সেক্রেটারি কার্লেস রেক্সাচ মেসির প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হন এবং কোনো রকম দ্বিধা ছাড়াই তাঁর চিকিৎসার পুরো দায়িত্ব নিতে রাজি হন। সেই থেকেই শুরু হয় আধুনিক ফুটবলের এক নতুন যুগের।
স্বনির্ভরতা ও মেসির হার না মানা মানসিকতা
কিশোর বয়সে মেসিকে নিয়মিত নিজের শরীরে গ্রোথ হরমোনের ইনজেকশন পুশ করতে হতো। ২০১৯ সালের এক সাক্ষাৎকারে মেসি বলেছিলেন, "সেই ইনজেকশন পেনটি সব সময় ফ্রিজে রাখতে হতো। বন্ধুদের বাড়ি গেলেও আমি সেটা সাথে নিতাম এবং নিয়ম করে ইনজেকশন নিতাম। ধীরে ধীরে এটা আমার জীবনের স্বাভাবিক অংশ হয়ে গিয়েছিল।"
মেসির এই লড়াই প্রমাণ করে যে, কেবল প্রতিভা নয়, চরম প্রতিকূলতা এবং প্রিয়জনদের জেদই একজন সাধারণ কিশোরকে বিশ্বসেরা 'লিওনেল মেসি'তে রূপান্তরিত করতে পারে। শৈশবের সেই ক্লাব কর্মকর্তাদের প্রত্যাখ্যান আজ ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম ট্র্যাজিক কিন্তু অনুপ্রেরণাদায়ক অধ্যায়।