• জাতীয়
  • দুর্নীতি দমনে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, কার্যকর বাস্তবায়ন চান বাংলাদেশের নাগরিকেরা

দুর্নীতি দমনে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, কার্যকর বাস্তবায়ন চান বাংলাদেশের নাগরিকেরা

ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল ও যমুনা টেলিভিশনের যৌথ সংলাপে উঠে এসেছে—বাংলাদেশের নাগরিকদের শীর্ষ উদ্বেগের মধ্যে দুর্নীতি অন্যতম। বিশেষজ্ঞরা কার্যকর সংস্কার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার তাগিদ দেন।

জাতীয় ১ মিনিট পড়া
দুর্নীতি দমনে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, কার্যকর বাস্তবায়ন চান বাংলাদেশের নাগরিকেরা

দীর্ঘ এক দশক ধরে দুর্নীতিকে দেশের শীর্ষ পাঁচটি উদ্বেগের মধ্যে অন্যতম হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশের জনগণ। ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল ও যমুনা টেলিভিশনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত 'দুর্নীতি কীভাবে কমবে' শীর্ষক নাগরিক সংলাপে তাদের সাম্প্রতিক জরিপের ফলাফলে এই তথ্য উঠে এসেছে। সংলাপে অংশগ্রহণকারী বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা একমত হন যে, দুর্নীতি দমন কেবল রাজনৈতিক অঙ্গীকারে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব সংস্কার ও কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।

দুর্নীতি দমনে নাগরিকদের প্রত্যাশা

বুধবার (৭ জানুয়ারি) যমুনা টেলিভিশনে এফসিডিওর আর্থিক সহায়তায় ‘বি-স্পেস’ প্রজেক্টের আওতায় এই নাগরিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের নভেম্বরের জরিপ অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারীদের মতে দুর্নীতি দমন আগামী সরকারের জন্য চতুর্থ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। একই জরিপে উঠে এসেছে, একজন সংসদ সদস্যের কাছে ৩০ শতাংশ নাগরিকের প্রধান প্রত্যাশা জনস্বার্থে কাজ করা এবং ২৪ শতাংশ নাগরিক সততা চান।

অধিকাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, বাংলাদেশ বর্তমানে ভুল পথে এগোচ্ছে এবং এর শীর্ষ পাঁচটি কারণের মধ্যে দুর্নীতির উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি, জরিপ অনুযায়ী ৩৩ শতাংশ ভোটার এখনো সিদ্ধান্তহীন, যার মধ্যে ৪৩ ভাগই নারী। ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের চিফ অব পার্টি ক্যাথরিন সিসিল এই সময়টিকে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন, কারণ ভোটাররা এখন ব্যালটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

প্রতিটি খাতে দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক কাঠামো

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম সংলাপে বলেন, পাসপোর্ট পেতে ৭৪ শতাংশ মানুষকে ঘুষ দিতে হয়। বিচার বিভাগ ও ভূমি ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতেও দুর্নীতি গভীরভাবে চেপে বসেছে। তিনি আরও বলেন, রাজনীতিবিদরা দুর্নীতি কমানোর আশ্বাস দিলেও এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি জনগণের কাছে স্পষ্ট নয়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. স্নিগ্ধা রেজওয়ানা দেশের আমলাতন্ত্র ও প্রশাসনিক কাঠামোকে ‘দুর্নীতিবান্ধব’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “ক্ষমতা মানেই টাকা”—এই সংস্কৃতি দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। ডিজিটালাইজেশনের কথা বলা হলেও সাধারণ মানুষ তার সুফল পাচ্ছে না।

রাজনৈতিক দলগুলোর ভাবনা ও বিশেষজ্ঞদের মতামত

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শামা ওবায়েদ জানান, বিএনপির ইশতেহারে দুর্নীতি প্রতিরোধ ও দমনে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকবে। এর মধ্যে বিচার বিভাগে দুর্নীতি বন্ধে আলাদা কমিশন গঠন, দুদকের সংস্কার, ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠন এবং টাকা পাচার বন্ধে অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) কেন্দ্রীয় নেতা শম্পা বসু দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াইয়ের জন্য ব্যাপক জনসচেতনতা এবং রাষ্ট্রকাঠামোর সর্বোচ্চ স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মত দেন। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক তাহসিন রিয়াজ দলীয় আনুগত্যের আড়ালে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়ার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন, তাদের দলে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধি ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আল মামুন রাসেল দেশের প্রায় প্রতিটি খাতেই দুর্নীতির বিস্তৃতি উল্লেখ করে বলেন, জবাবদিহিতা ছাড়া দুর্নীতি প্রতিরোধ সম্ভব নয় এবং অনিয়মে যুক্তদের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা করা হবে না।

চূড়ান্ত ঐকমত্য

সংলাপ শেষে বক্তারা একমত হন যে, কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিতে দুর্নীতি দমন সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। নাগরিকদের প্রত্যাশা পূরণের জন্য প্রয়োজন বাস্তব সংস্কার, কার্যকর জবাবদিহিতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার দৃশ্যমান প্রতিফলন।

Tags: politics bangladesh election corruption transparency anti corruption tib citizen dialogue